expr:class='"loading" + data:blog.mobileClass'>
চলছে । চলবে । অবিরাম...
ভালবাসার গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ভালবাসার গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

ভালবাসার মৃত্যু


২০০৬ সাল,আমি আর আমার এক বন্ধু জেলা শহরের একটি ভাল কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম।আমার বন্ধুর নাম জাকারিয়া।জাকারিয়া মফঃস্বল স্কুল থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছিল।আমারা একই স্কুল থেকে পাশ করেছিলাম।তারপর দুই জন একসাথে কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম।গ্রীষ্মকালের ছুটিতে দুজন বাসে করে বাড়িতে আসতেছিলাম। শহর থেকে আমদের বাড়ি দুই ঘণ্টার রাস্তা। দুজন গল্প করে আসতেছিলাম, হঠাৎ জাকারিয়া বলে “দোস্ত বিয়ে করে ফেলব” আমি বললাম মজা করস।
জাকারিয়া : নারে দোস্ত, আমি serious।
আমিঃ কারে বিয়ে করবি ?
জাকারিয়াঃ তোরে ত বলি নাই।আমি এস.স.সি পরীক্ষার পর ৩মাস বাড়িতে ছিলাম।তখন আমি আমার খালাত বোন(জেরিন) কে পড়াতাম।জেরিন আমাকে তখন ভালবাসার স্বপ্ন দেখাতে লাগলো। আমি আর তাকে ফিরাতে পারি নাই।আমিও জেরিনকে স্বপ্ন জালে বেঁধে ফেলেছিলাম।জেরিন আমাকে অনেক ভালবাসে।
আমি: দোস্ত এতকিছু আমাকে বল নাই ।
জাকারিয়াঃ বলব বলব করে বলা হয় নাই।তরে বললাম আর কাউকে বলি নাই।আজকে বাড়িতে গিয়ে আগে জেরিন আর সাথে দেখা করব।
তারপর দুজন বাড়িতে গেলাম।জাকারিয়ার বাড়ি আমাদের পাশের গ্রামে।ছুটিতে জাকারিয়ার সাথে খুব একটা  যোগাযোগ ছিল না।আমি ওর আগেই চলে আসলাম।
জাকারিয়াকে ফোন দিয়ে বললাম “তুই আসবি কবে”?
জাকারিয়া বললঃ দোস্ত আমার শরীর টা বেশি ভাল না,আগামীকাল আসতে পারি।
আমিঃ তাড়াতাড়ি চলে আই ক্লাস শুরু হয়েছে।
সেইদিন রাতে ১২ টার দিকে এক বন্ধু ফোন দিয়ে বলে “জাকারিয়া আর নেই”।
আমিঃ কি বলিস এই সব।আমি তখন বিশ্বাস করতে পারিছিলাম না।
বন্ধুঃ আজকে রাত ৯.৩০ টার দিকে বিষ খাইছে।
আমিঃ আমার সাথে ত সকালে কথা হয়েছে।কেন বিষ খাইল? তুই কি কিছু জানিস??
বন্ধুঃ জাকারিয়া জানতে পারছে যে, জেরিন আরেকটা ছেলেকে ভালবাসে।জাকারিয়ার সাথে সম্পর্কের আগেও অন্য একটা ছেলের সাথে সম্পর্ক ছিল।এই সব কিছু জাকারিয়া মানতে পারে নাই বলে আত্মহত্যা করছে।
পরেরদিন সকালে জাকারিয়ার বাড়িতে গেলাম।বারান্দাই সাদা কাপড়ে মোড়ানো জাকারিয়া ঘুমিয়ে  আছে।জাকারিয়ার মা পাশে বসে  কাঁদছে। আমাকে দেখেই আন্টি হাউ মাউ করে কেঁদে উঠল।আমি আর আমার কান্নাকে ধরে রাখতে পারলাম না।আন্টি আমাকে বলল,”বাবা তুমি কিছু জানতে না”?
আমিঃ আন্টি আমাকে ত তেমন কিছু বলে নাই।
 জাকারিয়া মাঃ বাড়িতে যে কইদিন যাবত আসেছে শুধু দেখতাম, পুকুর পারে ফোন কথা বলত। মাঝে মাঝে মন খারাপ থাকত। কিছু জিজ্ঞাস করলে কিছু বলত না।

আন্টি এই কথা গুলু বলে কান্না আর থামাতে পারল না...

আমার বউ আর আমার ফুটবল খেলা


ফুটবল খেলা আমার বউ এবং আমার দুজনের খুব পছন্দ। খেলাধূলাপ্রেমী মেয়ে আগে তেমন একটা দেখা যেত না। আজকাল মেয়েদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। তারা ক্রিকেট, ফুটবল থেকে শুরু করে রেসলিং পর্যন্ত বুঝতে শিখেছে। অবস্থা এমন যে সুযোগ পেলে ঘরে – বাইরে খেলতে শুরু করে দেয়। :'(


ভাল কথা। খেলাধূলায় আমার কোন না নাই, বরং মাত্রাতিরিক্ত উৎসাহ। সমস্যা অন্যখানে। এবং গুরুতর সমস্যা। আগে জানলে বিয়েই করতাম না, ধুরো। বউ আমার কট্টর ব্রাজিল সমর্থক। আর আমি জন্ম থেকে আর্জেন্টিনা। এবার বাছাই পর্বে আমার করুন দশা দেখে বউ বলে, “আহারে আমার সোনা, বুকে আসো।” মেজাজ কেমন লাগে!

তারপর কোনরকমে চান্স পেয়ে গেলাম। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা না থাকলে কেমন হত ভাবলে আতংকে গা শিউরে ওঠে। যাক এখন মাথা ঠান্ডা।
এক রাতে আদর সোহাগের মধুর পর্যায়ে বউকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি ব্রাজিল করো কোন দুঃখে? ওদের বেশীরভাগ খেলোয়াড় দেখতে খুব বাজে।”

মেয়েদের আমি যতটুকু জানি, তারা দলের থেকে সুন্দর খেলোয়াড়দের প্রতি অধিক আকৃষ্ট থাকে। এই কারনে ইটালী, আর্জেন্টিনার মেয়েভক্ত তুলনামূলক ভাবে বেশী।
বউ আদর করে বলে, “দেখো চেহারা নিয়ে আমার বিশেষ মাথাব্যথা নাই। তাইতো তোমার ঘর করি। আমার প্রিয় খেলোয়াড় রোনালদিনহো। তারে এবার ডুঙ্গা নেয় নাই দেখে খুব খারাপ লাগতেসে।”
বউ আমাকে জড়িয়ে ধরে কষ্ট শেয়ার করতে চায়। আমার কেমন জানি অস্বস্তি লাগে।


রাতে ভাল ঘুম হয় না। সকালে অফিস যাবার আগে অভ্যেস মত একবার আয়নার সামনে দাঁড়াই। ভুত দেখার মত চমকে উঠি। দাঁত বের করে হাসছে রোনালদিনহো।
মাথা থেকে দুশ্চিন্তা ঝেটিয়ে বিদায় করি। বিশ্বকাপে মেসি ছাড়া কেউ নাই, কেউ নাই। বউ এর আমার দলে আসতে সময় লাগবে না। আর মাত্র কয় দিন। মেসিডোনা শুরু হলো বলে।


সপ্তাহশেষের ছুটিতে বউ নিয়ে শ্বশুরবাড়ী যাই। দুপুরের খানাপিনার পরে ড্রয়িংরুমে শ্বশুরমশাই গল্প শুরু করেন আমার সাথে। এই ভদ্রলোক কখনো বুঝতে চান না, আমি গল্প করতে আসছি আমার একমাত্র শ্যালিকার সাথে, উনার সাথে না। অযথা এই প্যাচাল সেই প্যাচাল শেষে আসল বিশ্বকাপ।

“বুঝলা বাবা, রোনালদোর চেয়ে বড় কোন প্লেয়ারই নাই। আহ, কি সব গোল। এখনো চোখে লেগে আছে।”
আমি জিজ্ঞেস করি, “কোন রোনালদো?”
চশমার ভেতর থেকে চোখ বড় বড় করে তিনি বললেন, “তুমি ব্রাজিলের সাপোর্টার না?”
মিষ্টি হেসে বলি, “জ্বী না বাবা, আমি আর্জেন্টাইন সমর্থক। আমার দেখা সেরা খেলোয়াড় মেসি। আপনি কি ব্রাজিল সাপোর্ট করেন?”
শ্বশুরমশাই আমার দিকে ফিরেও তাকালেন না, রিমোট কন্ট্রোল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। হাসিমুখে আমি দুইবোনের রুমের দিকে অগ্রসর হই।


আস্তে আস্তে বুঝলাম ঘটনা বিস্তারিত। বাপের ব্রাজিল্প্রেম মেয়েদের মধ্যে সংক্রামিত হয়েছে। না বুঝে না শুনে এরা অন্ধকারে পতিত হয়েছে। এখন মেসি দুনিয়া উলটানো খেলা খেললেও তাদের মন ভরবে না। আর এখানেই শেষ নয়। শ্বশুরমশাই পুরোদমে এন্টি-আর্জেন্টিনা, সেই সাথে সাথে আমার বউ। আমি অবশ্য এন্টি-ব্রাজিল ছিলাম না। কিন্তু ছোটবেলা থেকে ব্রাজিল সাপোর্টারদের কাছে পঁচানি খেতে খেতে মন বিষিয়ে গেছে। এখন ব্রাজিল দুচোক্ষে দেখতে পারি না। হায় খোদা, ব্রাজিলের মেয়ে জুটাইলা আমার কপালে! মন চায় আর্জেন্টিনা চলে যাই, সেখানের কোন এক রমনীকে বিবাহ করে সুখে শান্তিতে ফুটবল খেলি।


নাহ, এত সহজে ছেড়ে দিলে হবে না। বিগ ম্যাচে মাথা ঠান্ডা রেখে খেলতে হবে। দুর্দান্ত ট্যাকটিকস খাটাতে হবে। আমি কোন ছাড় দিব না। অফিস থেকে ফেরার পথে স্টান্ডার্ড মাপের একটা আর্জেন্টিনার পতাকা কিনে বাসায় ফিরি। বউ এর সাথে আহ্লাদ করার আগে, কোনকথা বলার আগে বারান্দার বাইরে পতাকা উড়িয়ে দেই। তারপর সন্ধ্যা শেষ হয়, রাত বাড়ে। বউ কোন কথা বলে না। আমি ফেইসবুক, ব্লগ আরো নানাবিধ দরকারী বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকি। বউকে এত পাত্তা দেয়ার কি আছে? রাতে তো তাকে আমার কাছে আসতেই হবে। :P :P :P


সে পাশ ফিরে শুয়েছিল। আমি আলতো করে ফেরালাম। চাঁদের আলো পড়েছে অনিন্দ্য সুন্দর মুখটায়। বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
- আমার ব্রাজিলের ফ্লাগ কই?
- ব্রাজিলের ফ্লাগ আমি কই পাবো, লক্ষ্মী! (আমার আহ্লাদ)
- শোনো, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো না? (বউ গম্ভীর)
- এটা তুমি কি বলো, জান!
- তাহলে তুমি অবশ্যই কালকে একটা ব্রাজিলের ফ্লাগ আর জার্সি কিনে নিয়ে আসবা। মনে থাকবে?
কোন উত্তর দেই না। এ অসম্ভব! আমার বারান্দায় উড়বে ব্রাজিলের পতাকা? তার আগে আমার মরণ ভাল।
“আচ্ছা লক্ষ্মী, ঠিক আছে।” ক্লোজ হবার চেষ্টা করি। ব্রাজিল ভুলিয়ে দিবো ভালোবাসা দিয়ে।
কিন্তু বউ সিরিয়াস। “তুমি আগে কিনে নিয়ে আসো। তার আগে চান্স নাই। গুড নাইট, সোনা।”
টেনশনে আমার মাথার চুল যে কয়টা অবশিষ্ট আছে টেনে ছিড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। এখন আমি কি করবো? বউ আগে না ফুটবল আগে!


যথাসময়ে বিশ্বকাপ শুরু হলো। দ্বিতীয় দিনেই আর্জেন্টিনার খেলা। জার্সি গায়ে দিয়ে রুচি চানাচুর মাখা মুড়ি নিয়ে বসে পড়ি, “কই আসো, খেলা শুরু হয়ে গেল জান।”
মেসি মাঠে নামার আগে আচমকা আমার মাথা ঘুড়ে গেল। কোন এক সহাস্য ব্রাজিলিয়ান দেবী আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে, “আমাকে কেমন লাগছে?”
সত্যি বলতে কি, অদ্ভুত সুন্দর লাগছে বউকে। ক্যাটকেটে হলুদ রঙের সবকিছু আমার দুচোখের বিষ। আজ সব এলোমেলো হয়ে গেল। আমি কিছু বলি না। চুপচাপ চেয়ে থাকি।
দেবী হাসে, “কি কিছু বলো না কেন? তুমি আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে দিয়ে থাকবা আর আমি বসে বসে তোমাকে দেখবো তা হবে না।”
খেলা শুরু হয়। একটা গোল হয়ে যায়। আমার মনে বসে না সেদিকে। আমার তখন অন্য কিছু খেলতে খুব করে ইচ্ছে করে।


ব্রাজিলের খেলা শুরু হলো রাতে। ভোরবেলা অফিস। আমার খালি ঘুম পায়। তবু বউকে রেখে তো ঘুমানো যাবে না। অগত্যা রাত জেগে ম্যাড়ম্যাড়ে খেলা উপভোগ(!) করি। আমার জন্য চূড়ান্ত বোরিং। কারন এসময় সে থাকে মহা টেনশনে। তাই সম্পূর্ন টাচ ফ্রি থাকতে পছন্দ করে।


প্রথমদিনের খেলা নিয়ে দুজন দুজনকে পঁচাই। আমরা নিজেরাও নিজেদের খেলায় তুষ্ট না। পঁচায়ে তেমন আরাম পাই না। উলটো সাউথ কোরিয়ার সাথে আর্জন্টিনার খেলা কিছুটা ভয় ভয় নিয়ে শুরু করি। সব শংকা কাটায়া গোল, গোলের পর গোল। ছোট ভাইরে সাথে নিয়ে উল্লাস শুরু করি। বউ দেখি চুপচাপ বিশেষজ্ঞের মতন খেলা দেখতেছে। হঠাত একটা গোল দিয়ে দিল কোরিয়া। মেজাজ চরম খারাপ। ডিফেন্সের হাবলামি ভুলে গোল। এদিকে আমার বাসার মধ্যেই আমাদের কাজের ছেলে গোল গোল করে চিৎকার করতেসে।
- কিরে বেকুব, তুই লাফাস কেন?
- ভাইয়া, আমি আফামনির দলে।
বউ দেখি অন্যদিকে তাকায়া মুচকি হাসে। বুঝলাম সে চিল্লানোর জন্য লোক ভাড়া করে রাখসে। হায়রে, খেলা পারে না অথচ এদের টেকনিকের শেষ নাই।


ইতিমধ্যে বউ ঘোষনা দিয়ে দিয়েছে, আমার বাসায় দুইখানা পতাকা পাশাপাশি পতপত করে উড়লেও তার নাকি এটা শত্রুশিবির মনে হয়। সুতরাং ব্রাজিল ফাইনালে উঠলে সে নিজ গৃহে বসে ফাইনাল খেলা দেখবে। আর সেই সাথে আমাকে তাদের বাসায় খেলা উপভোগ করার নিমন্ত্রন।
আমি ও বলে দিয়েছি, “আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতলে তোমাকে একটা স্পেশাল গিফট দিবো।”

কি দিবো এখনো অবশ্য ঠিক করি নাই, আগে বিশ্বকাপটা জিতে নেই। সময়ে দেখা যাবে।

( আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল দুইটাই গেল। মাঝখান দিয়ে লাভের মধ্যে একটা লাভই হোল। আমার গিফটের টাকাটা বেঁচে গিয়েছে। )

(কল্পিত)

একটি অত্যন্ত সাধারণ ও বোকা মানুষের ভালোবাসাহীন জীবনের গল্প


আম্মা আজকাল ঠিকমত হাটতে পারেননা।হাঁটার সময় কেমন যেন একটা জড়তা কাজ করে।নিজের হাতে ঘরদোর পরিষ্কার করতে ভালোবাসতেন।এখন আর সেটাও করেন না।চুপ করে নিজ ঘরে বসে কলকাতার সুনীল বাবু,সমরেশ এদের গল্প উপন্যাস পড়েন আর মাঝে মাঝে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ পানে তাকিয়ে তাকিয়ে কি যেন ভাবেন।বাবা দেশের বাহিরে ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত,মাঝে মাঝে দেশে আসেন।আর আমি এই-সেই চাকরী বাকরী, সদ্য বিয়ের পর গড়ে ওঠা সংসার এসব নিয়েই খানিকটা ব্যস্ত।টঙ্গী কলেজ গেটে অবস্থিত আমার ছোট্ট ভাড়া বাড়ির মাঝে আমাদের ছোট্ট একচিলতে অনুভূতিহীন নিথর পরিবার।তাতে কি যেন থেকেও নেই!

তিন মাস আগে আমার স্ত্রী পরিচয় পাওয়া তিথী নামের অতি সাধাসিধে মেয়েটি আমার মায়ের থেকে বোধহয় একটু দূরে দূরেই থাকেন, আর আমার থেকে অনেক অনেক দূরে।বিয়ের আগে তার সাথে যেদিন প্রথম দেখা হয়, সেদিন এত শান্ত কোমল মেয়েটিকে কি করে যেন নিজের কাছের বলেই মনে হয়েছিলো।পরবর্তী দেখা বিয়ের পর যখন আমি বাসর ঘরে যাই।তখন তার প্রথম কথা ছিলো, “আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাইনি”।

ব্যস এভাবেই শুরু হলো আমাদের সুখের সংসার।গত তিন মাসে কোনদিন একবারের জন্যও এমন হয়নি যখন আমি তার পাশে যেয়ে একটু আকাশ পাতালের কল্পকথা গাইতে পারি।তিথী আমাকে দেখলে কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করে, তখন মনে হয় আমি যেন অনেক দূরের কেউ।তাই আমি অত্যন্ত লজ্জিত ও অনুতপ্ত বোধ করি এবং যতটা সম্ভব নিজেও ওর থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করি।

মা জানেন সব কিছু, কিন্তু কখনো কিছু বলেন না।মা মনে মনে তিথীকে বেশ ভালোবাসেন আমি টের পাই।তিথীকেও দেখি মায়ের পাশে বসে মাঝেসাঝে কি নিয়ে যেন কাঁদে। আর আমি আমাদের নীরস সংসারে না পারি কাঁদতে, না পারি হাসতে।কিন্তু বিশ্বাস করুন এতে আমার মনে কোন দুঃখ নেই।আমি এভাবে বাঁচতেই শিখে গেছি সেই ছোট্টকাল হতে।বাবাকে জীবনে পেয়েছি খুব অল্প সময়ের জন্য, মা একটা বয়সের পর আমাকে আমার হাতেই ছেড়ে দিয়েছেন।স্কুল কলেজের হাতেগোণা কিছু বন্ধুবান্ধব রয়েছে বৈকি যারা এখন বেশিরভাগ ইউএসএ, কানাডা অথবা যুক্তরাজ্যে পি.এইচ.ডি করছে বা করা শেষ হয়েছে।সবাই তারা ভালো আছে, অনেক ভালো।আমি শুধু রয়ে গেছি জরাজীর্ণ আবার একই সাথে অতি ব্যস্ত নগরী ঢাকার ছোট্ট এক কোণায় ভালোবাসাহীন জীবনে।মাঝে মাঝে নিজেকে শুধু প্রশ্ন করেছি, আমার জীবনে ভালোবাসারা কোথায়?মনে হয় আমাদের সবারই মনের কোণায় এই প্রশ্নটি প্রায়ই উঁকি দিয়ে যায়, তাই না?

শুক্রবার দিন ভোরবেলা অফিসে আসলাম অত্যন্ত বিরক্ত চিত্তে।মরার চাকরীতে উইকেন্ড পাওয়ার সুযোগ মাঝে মাঝে জোটেনা।একারণে প্রায়ই মনে হয় ভেগে যাই বনে বাদাড়ে এইসব ফালতু চাকরী বাকরী ছেড়ে।টারজানের মত গাছে গাছে বানর হয়ে ঝুলবো আর ফলমূলের জুস খাবো।তারপর যখন আবার পরিবারের কথা মনে হয় তখন শুধুই একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলি আর ভাবি কবে একটু শান্তি পাবো।আজকে সকালে অফিসে এসেই শুনি আমার চাইনীজ বস আমাকে খুঁজছে।আমি হন্তদন্ত হয়ে বসের রুমে ঢোকার সাথে সাথে সে আমার দিকে ক্রুর দৃষ্টি দিয়ে বললো, “মাই ডিয়ার, তোমার চাকরী আর নেই।যাও রাস্তা মাপো”।

আমি সুন্দর হাসি দিয়ে বললাম, “ভাগতে পারলে ভালোই হতো স্যামি, কিন্তু তুমি তো আমাকে ছাড়বেনা। কি দরকারে খুঁজছিলে সেটা এখন বলো।”

স্যামি আমার দিকে আরো ক্রুর দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে বললো, “ফেব্রুয়ারীর ৫ তারিখ তোমার কানাডায় ফ্লাইট।ছয় মাস থাকতে হবে আমাদের ম্যানুফ্যাকচারিং স্টেশনে।যদি না যেতে চাও তাহলে আমার টেবিলের ওপরে আরেকটা লেটার আছে, তোমার টারমিনেশন।ওইটা নিয়ে ভাগো”।

আমি একটুখানি অবাক হলাম, কিন্তু তা ঘটনার আকস্মিকতায়।তবুও স্বাভাবিক ভঙ্গীতে মাথা নেড়ে বললাম, “পাসপোর্ট করা হয়নি, পরে জমা দেবো।”এটা বলে যখন চলে যাচ্ছিলাম তখন স্যামি আবার ডাকলো, "অর্ক তুমি একবারও আমাকে থ্যাঙ্কস জানালেনা।তুমি একটু অদ্ভুত, বেশি বেশি অদ্ভুত।”

আমি জানিনা আমাকে কেন সে অদ্ভুত বললো, আমার কাছে একবারও ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগেনি।অদ্ভুত লাগা শুরু হলো যখন ম্যানিটোবার উইনিপেগ শহরে যা পৃথিবীর শীতলতম শহর বলে পরিচিত সেখানে পৌছালাম।গ্লোবালাইজেশন কি সেটা কেউ বুঝতে হলে অবশ্যই তাকে এই সিটিতে আসতে হবে।চমৎকার সাজানো গোছানো শহরে সুন্দর কিছু পার্ক এবং অত্যাধুনিক মিউজিয়াম অবস্থিত যা ঘুরে ঘুরে দেখবো বলে আগেই প্ল্যান করে রেখেছি।

আমার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হলো উইনিপেগ রেইলওয়ে মিউজিয়াম থেকে ২ কি.মি. দূরবর্তী একটি ছোট্ট বাঙ্গালী এপার্টম্যান্টে।আমার পাশের এপার্টমেন্টে থাকে একটি বাঙ্গালী পরিবার যাদের আতিথেয়তায় আমি নিঃসন্দেহে বিমুগ্ধ।আমি প্রথম যেদিন আমার ফ্লাট 5Aতে থাকার জন্য উঠলাম, সেদিনই আমার সাথে একটু মোটাসোটা করে মধ্যবয়স্ক রিয়া আন্টি দেখা করতে এলেন একটা বিশাল কোম্বল আর দুইটিন বিস্কুট নিয়ে।আমার দিকে বেশ আপন আপন দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে বললেন, “বাবা তুমি চাইলে এই কম্বলটা ব্যবহার করতে পারো।আর কিছু কুকিজ আছে।যদি রাতে ক্ষুধা লাগে খেয়ে নিতে পারো”।

আমি এবং আমার ক্ষুধার্ত পেট অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সাথে তাকে ধন্যবাদ জানালো।একটু পরে তার দুই মেয়ে এসে আমাকে চিড়িয়াখানার বাসিন্দা হিসেবে কেমন যেন একটা উইর্ড লুক দিলো যাতে আমি বেশ মনঃকষ্টের শিকার হলাম।মেয়েগুলার নাম খুবই সুন্দর- ত্রপী আর ত্রিপি।একজন ডাক্তারী পড়ছে, আরেকজন কেবল এ লেভেল শেষ করেছে।সেদিন রিয়া আন্টি আর ত্রপি-ত্রিপীর সাথে আর বেশি কথা হলোনা।

পরবর্তী এক সপ্তাহ খুব ব্যস্ত ছিলাম কাজে অকাজে।দুদিন ছুটি পেয়ে রিয়া আন্টির বাসায় গেলাম সামান্য কিছু গিফট নিয়ে।আন্টি তখন পিঠা বানাচ্ছে এবং তার দুই মেয়ে বসে বসে একটি এনিমেশন মুভি দেখছে।আমিও মুভি দেখতে বসে পড়লাম এবং কিছুক্ষণ পর আন্টির হাতে বানানো চমৎকার কিছু কুলি পিঠা ভক্ষণ করে মনের আনন্দে তেলতেলে হাসি দিয়ে বললাম “ধন্যবাদ”।"

এরপর কথা বলতে বলতে জানলাম, এই পরিবারটি কানাডা এসেছে ১৬ বছর আগে।আসার কিছুদিন পর আঙ্কেল হার্টের সমস্যায় পড়েন এবং দুইমেয়ে এবং তাদের মাকে একা রেখে চলে যান।আমি জানিনা কি সেই মানসিক শক্তি যার জন্য রিয়া আন্টি তার মেয়েদেরকে নিয়ে এই অপরিচিত শহরে বাস করার সাহস পেয়েছিলেন।দেশীয় সংস্কৃতি আর আচার ব্যবহার তার মেয়েদের মাঝে ছড়িয়ে দিতেও উনি বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেননি।আমি সত্যিই ভাগ্যবান এই দূরদেশে এসে এমন চমৎকার একটি পরিবারের সান্নিধ্য পেয়েছি বলে।

সমস্যা হলো যখন আমি আরো ঘনিষ্ঠ হলাম এই পরিবারটির সাথে।জানতে পারলাম ত্রপী ডাক্তারীতে ভর্তি হওয়ার পর একটি ছেলের প্রেমে পড়ে তার জীবনের সব হারিয়ে এসেছে।অত্যন্ত লজ্জার সাথে জানাচ্ছি ছেলেটি বাংলাদেশী ছিলো।ত্রপী কি করে সেই কষ্ট আর যন্ত্রণা ভুলে জীবন চালিয়ে নিচ্ছে আমি জানিনা, অবশ্য জানার আগ্রহ আমার মধ্যে বেশ কম।এই ছোট্ট পরিবারটি নিদারুণ টানাটানির মধ্যে বেশ হাসিখুশি বলেই জানতাম।কিন্তু সত্যি বললে কি তারা আসলে ভালো নেই আমি এটা বেশ বুঝতে পারি।

ত্রিপী খুব চঞ্ছল একটি মেয়ে এবং প্রায়ই আমাকে বলে “তুমি বিয়ে না করলে তোমার সাথে বেশ প্রেম করা যেত, তাই না অর্ক”" আমি বড় বড় চোখ করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি।

এভাবে করে একমাস চলে গেলো।কোন এক ছুটির দিনে আমি আমার এপার্টমেন্টের ছোট্ট জানালা দিয়ে তুষারপাত দেখছিলাম, ঠিক তখন ত্রিপি এসে দরজায় নক করলো।তার চোখ দেখলাম কাঁদতে কাঁদতে ফুলে আছে।সে ভয়ে ভয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “তুমি কি একটু বাসায় আসবে?আপু না আবার ঘুমের ওষুধ খেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে”"।

আমি সাথে সাথে দৌড়িয়ে ওদের বাসায় গেলাম।দেখলাম আন্টি মেডিকেল সাপোর্টের জন্য ফোনে কথা বলছে।ত্রিপি বড় বড় অসহায় চোখ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “আপুর কিছু হলে আমি মরে যাব”।
আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, “একটু ব্রেভ হও, বি পেশেন্ট।কিছু হবেনা”।

আমার ধারণা মিথ্যা ছিলো যা এর পাঁচ ঘন্টা পরে জানা গেলো।আমি এরপর কি হয়েছে তা পাঠককে জানাতে চাইনা।আমার জীবনের অন্যতম খারাপ সময় আমি তখন কাটিয়েছি।আমি ত্রপীর আত্নার জন্য প্রার্থনা করি যেন যেই কষ্ট বুকে নিয়ে মেয়েটি পৃথিবী থেকে বিদায় নিলো আল্লাহ যেন তা মুছে দিয়ে মেয়েটিকে জান্নাতে থাকার সুযোগ করে দেন।রিয়া আন্টি আর ত্রিপির দিকে আমি ভয়ে তাকাতাম না।যে ভয়ংকর শূন্যতা তাদের নয়নে আশ্রয় নিয়েছিলো তার গভীরতা আমার মত অনুভূতিহীন মানুষ কোনদিন খুজে পাবেনা।নিঃসঙ্গ ত্রিপীকে আমি বেশ সময় দিতাম তখন।আমি ভয় পেতাম যদি সেও তার বোনের মত কিছু করে বসে।
হঠাৎ করে একদিন ত্রিপী আমাকে বললো, “অর্ক আমি আপুর মত বোকা না।আমি জানি আমার কি করা উচিত আর কি উচিত না।Don’t Worry; ok?”

আমি তার দিকে আশ্বস্ত হাসি দিয়ে বললাম “ধন্যবাদ”।

হঠাৎ করে ওর সোনালী রঙ করা চুলের ফাঁকে মায়াময় মুখটি দেখে মনে হলো, কোথায় যেন আমি ওকে দেখেছি।উত্তর পেলাম তিন মুহূর্ত পর।ওর সাথে তিথীর মুখমন্ডলে কোথায় যেন একটু মিল আছে, সামান্য হলেও আছে।

“এভাবে তাকিয়ে আছো কেন, আমার প্রেমে পড়েছো”?

ত্রিপীর মুখে এমন প্রশ্ন শুনে আমি কিছুটা নয়, বেশ খানিকটাই অপ্রস্তুত হলাম এবং বললাম, “আমি ভালোবাসতে জানিনা”।

ত্রিপীর তার মুখ থেকে চুল সরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “আমিও জানিনা।কিন্তু তোমাকে কেমন যেন লাগে”।

আমি ওর সামনে থেকে উঠে চলে এলাম।নিজেকে বড় ক্লান্ত নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছিলো।আমার অপু নামের সেই ছেলেটার কথা বার বার কেন যেন মনে পড়ছে।তিথী কি অপুর দিকে ওভাবেই তাকাতো আজকে যেভাবে ত্রিপী আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো।বিয়ের রাতে যখন তিথী আমায় বলে অপুর কথা তখন আমি একটুও কষ্ট পাইনি।আমার আসলে জানতে ইচ্ছা করছিলো বারবার, সে কোন ভালোবাসার বুননে তিথী অপুকে বেধেছিলো যা ছিঁড়ে ফেলে ছেলেটি মহাকালে পাড়ি জমিয়েছে।তিথীকে বলতে ইচ্ছা করছে, প্রিয় তিথী অপুকে দেয়া তোমার ভালোবাসা সবটাই তোমার কাছে পবিত্র আত্নার দাবী হয়েই থাকুক।আমি তাতে কখনো জায়গা চাইনি, চাবোওনা।তুমি তোমার হারানো স্বপ্নগুলো নিয়ে সুখে থাকো, অনেক অনেক সুখে।

ত্রিপীর কথা ভাবছি,এই প্রথম কোন মেয়ে আমাকে বললো তার আমাকে খানিকটা হলেও ভালো লাগে।বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমার ডিপার্টমেন্টের বরুণা নামের একটি মেয়েকেও আমার বেশ ভালো লেগেছিলো।কি অদ্ভুত ব্যাপার, কোন একদিন আমার ক্লাসেরই আরেকটি ছেলের সাথে তার ফাটাফাটি প্রেম শুরু হয়ে যায়।ওই বয়সে সেটা হয়তো বড়সড় আঘাত ছিলো যে জন্য আমি প্রায় বছরখানেক সুস্থ ছিলাম না।বরুণাকে কেন ভালোবেসেছিলাম তাও নাহয় বলেই ফেলি।ওর নয়নজোড়া আর তার মাঝে লুকিয়ে থাকা প্রগাঢ়তা আমাকে খানিকটা ভালো লাগা দিয়েছিলো, কিন্তু ভালোবেসেছিলাম ওর কাউকে পাত্তা না দেয়ার মানসিকতাকে অথবা ওর নারী হওয়ার অহংবোধকে।

সেই বরুণা,সেই ভালোলাগার মেয়েটি আমাদের ফেয়ারওয়েলের দিন আমার কাছে এসে বললো, “অর্ক তুমি এখনোও আমার দিকে কিভাবে যেন তাকাও।মজার কথা বলি, আমার তোমাকে কিন্তু কখনো খারাপ লাগেনি।এখন যে শুভ্রর সাথে আছি, তবুও তোমাকে খারাপ লাগেনা।কারণ তোমার তাকানোর মাঝে কিছু একটা আছে।এভাবে কেউ তাকিয়ে থাকলে মেয়েদের কিন্তু ঘৃণা, বিরক্তি এমন কিছু হয়না।কিন্তু ভয় হয়, প্রবল ভালোবাসার ভয়। আমার কথা বুঝেছো?”

আমি মাথা নেড়ে অনুভূতিহীন দৃষ্টি দিয়ে ওর দিকে চেয়ে থাকলাম।ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, “আমি জানতাম তুমি বুঝবেনা।কিন্তু একটা কথা বলে যাই, কখনো কাউকে ভালো লাগলে তাকে বলে ফেলতে শেখো।ঠিক আছে?”

আমি কিছু না বলে মাটির দিকে চেয়ে ছিলাম।কি যে মনে হচ্ছিলো নিজেও জানিনা।

ত্রিপির সাথে আমি সেদিনের পর অনেকদিন কথা বলিনি।ঠিক দেশে ফিরে যাওয়ার এক সপ্তাহ আগে রিয়া আন্টি আর ওর সাথে দেখা করতে গেলাম ওদের ফ্লাটে।চলে যাওয়ার সময় ত্রিপি অনেকক্ষণ আমার সাথে এপার্টম্যান্টের পাশে লনে গিয়ে হাঁটলো।আমি বুঝতে পারছিলাম না ওকে কি বলবো।ওই আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “চলে যাচ্ছো ৫ তারিখ?”
আমি হাসিমুখে তাকিয়ে বললাম, “হ্যা”।

এবার ও আমার হাত ধরে বললো, “তোমাকে সেদিন মিথ্যা বলেছিলাম।আমার তোমাকে আসলে ওভাবে ঠিক ভালো লাগেনা।মনে হয় শুধু একটু উইর্ড টাইপ।বুঝেছো না?”

আমি আবার হাসিমুখে বললাম “হ্যা”।

“কিন্তু আমার অনেক একা একা লাগে জানো?যখন মনে হয় তুমি চলে যাবে, আমি তোমাকে আর দেখবোনা, তোমার এই ঝকঝকে নীল জিন্সের জ্যাকেট আর চোখের সামনে আসবেনা তখন অনেক কষ্ট হয় জানো” এটুকু বলে ত্রিপি আমার দিকে আবার কেমন করে যেন তাকিয়ে থাকলো।আমি অত্যন্ত অস্বস্তি বোধ করছিলাম।

আগস্টের ৫ তারিখ আমি সেইন্ট এন্ড্রিউস এয়ারপোর্টের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।রিয়া আন্টি আমাকে বিদায় দিতে আসতে পারেননি।কিন্তু ত্রিপি ঠিকই এসেছিলো বেশ হাসিমুখে।আমার জন্য কিছু চকোলেট আর একটা সুন্দর উলের মাফলার নিয়ে যা রিয়া আন্টি বানিয়ে দিয়েছিলো।ও যতই হাসিমুখে থাকুক, আমি ওর চোখের কোণায় হীরকজলের ঝিকিমিকি দেখতে ভুল করিনি একটুও।ওর ভালো লাগার কথা জানার পর থেকে আমি যে অনুতাপের আগুনে দগ্ধ হয়েছি সেটা কি কেউ জানে?মনে হয় না।
আমি যাওয়ার আগে ত্রিপির মাথায় হাত দিয়ে বলেছিলো, "ভালো থেকো মেয়ে"।
ও আমার বুড়ো আঙ্গুল ছুয়ে বলেছিলো, তুমিও যাকে ভালবাসো তাকে নিয়ে অনেক ভালো থেকো।

এটুকু বলে একবারও সে আমার দিকে তাকালোনা।পিছনে ঘুরে দ্রুত পায়ে চলে গেলো, রেখে গেলো একটুকরো হতাশা।আমি সমস্ত আকাশ পথে কিছু মুখে দিতে পারিনি।আমাকে কি কেউ কখনো ভালবেসেছে?মনে হয় না।যখন কেউ এভাবে ভালবাসলো তখন আমার সামনে তিথীর শান্ত স্নিগ্ধ মুখটা বারবার ভেসে ওঠে।আমি তখন আর কিছুই ভাবতে পারিনা।আফসোস!যে তিথী আমার কাবিন করা বউ,তার হৃদয়ে আমাকে খানিকটাও আশ্রয় দেয়নি।

বাংলাদেশ পৌছালাম গভীর রাতে।মা আমাকে নিতে এসেছে।আমি বুঝিনা এত গভীর রাতে মা কেন কষ্ট করে নিতে আসলো।আমাকে দেখে মায়ের অনেকদিনের জমাট বাঁধা চোখের জল গড়িয়ে পড়লো।গাড়িতে উঠে দেখি তিথি বসে আছে।আমি বসলাম মাঝে আর দুই পাশে তিথি ও মা।মা তিথিকে বার বার বলছে, “আমার ছেলে আমার বুকে ফিরে আসছে”"।

আমি তিথির পাশে যতক্ষণ বসে ছিলাম ততক্ষণ অস্বস্তি বোধ করছিলাম।মনে হচ্ছিলো ও সামাজিকতার খাতিরে বাধ্য হয়ে এসেছে।আমার এটা ভালো লাগেনা।

বাসায় গিয়ে দেখি এলাহী রান্নাবান্না।আমার নীরস ছোট্ট বাসা আর তার মাঝে বাস করা লিলিপুট পরিবারে কেমন যেন জীবনের আলো ঝিকমিক করছে।রাতে খেয়েদেয়ে যখন ঘুমুতে গেলাম, তখন তিথি আমার পাশে এই প্রথমবারের মত বসে প্রশ্ন করলো, কেমন আছি।আমি মাথা নেড়ে বোঝাতে চাইলাম খারাপ না।ও আমাকে অবাক করে দিয়ে এরপর প্রশ্ন করলো, “আপনি আমার সাথে একদিনো কথা বলেননি এই ছয় মাসে।কেন”?

আমি আমতা আমতা করে জবাব দিলাম, “তোমার হয়তো ভালো লাগতোনা”।

ও একটু চুপ থেকে হাতে কাচের চুড়িগুলো ধরে ঘুরোতে ঘুরোতে বললো, “আমার অনেক কষ্ট হয়েছে।আর এমন করবেন না”।

আমি কিছু না বলে চুপ করে বসে আছি।ও এবার আমার একদম কাছে এসে বসে বললো, “প্রমিজ করুন আর আমাকে ছেড়ে যাবেন না”।
আমি অনেক অভিমান নিয়ে বললাম “পারবো না”"।

সেদিন রাতে তিথি যখন ঘুমিয়ে পড়লো তখন আমি ভাবছিলাম ত্রিপি এখন কি করছে?আমার থেকে বছর আটেক ছোট্ট একটি মেয়ের ভালোবাসায় কতটা গভীরতা ছিলো সেটা আমি জানিনা।তার কালোর মাঝে হালকা সোনালী চুলের মাঝে দিয়ে দেখতে পাওয়া সেই মায়াভরা চোখজোড়া এখন কি লোনাজলে সিক্ত হয়ে আছে?আমি মনে মনে বলি, ত্রিপি তুমি অনেক ভালো থেকো।ধরিত্রীর সকল শোভিত পুষ্প তোমাকে তাদের সুবাসে আলিঙ্গন করে থাক।

অন্যরকম ভালোবাসা


সাধারণ দুটি জীবনের অসাধারণ আবেগের অনুভূতি। হয়ত দু'জন দুজনের জন্যই অপেক্ষা করছিল। এটি কোন প্রেমের গল্প নয়। এ গল্প আবেগের, অনুভুতির। সৃষ্টিকর্তা যে মানুষকে অসাধারণ কিছু পুরষ্কার দেন তা হয়ত তবাস্মি আর অনিমেষ পেয়ে গেছে। তা হল দু'জনের জন্য আবেগের অনুভূতি। এ আবেগ প্রেমের নয়, বন্ধুত্বের।

সাধারণ মেয়ের মতই তবাস্মির জীবন। সবই আছে তবুও নিঃসঙ্গ। চারিদিকে মানুষের ভিড়ে একা হয়ে যেত। অনুভূতিগুলো ভাগ করে নেওয়ার কেউ ছিল না। বান্ধবীদের অবহেলায় প্রায়ই কাঁদত,অভিমান হত খুব। কেন অন্যদের মত তার বন্ধু নেই? সৃষ্টিকর্তা কাছে প্রার্থনা করে প্রায়ই রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে কাউকে চাইত যে তাকে বুঝবে,তার বন্ধু হবে। এভাবে কত রাত যে কেটেছে......

অনিমেষও সাধারণ,তবে তবাস্মির মত নিঃসঙ্গ নয়। বন্ধু ছিল তবে কোনো প্রিয় বন্ধু ছিল না। আসলে তবাস্মিকে পাওয়ার আগ পর্যন্ত সে প্রকৃত বন্ধুত্ব সম্পর্কে জানতই না। তাকে পেয়ে সে বুঝেছে যে তার আগের বন্ধুরা কেউই তার সাথে প্রকৃত বন্ধুর মত আচারণ করেনি। শান্ত প্রকৃতির অনিমেষ,খুব বেশি দূরন্ত নয় তবে মাঝে মাঝে চঞ্চল হয়ে ওঠে। এই হল অনিমেষের পরিচয়।

এবার আসা যাক আসল গল্পে। সকলের অবহেলা মুখবুজে সহ্য করতে করতে যখন তবাস্মি একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছিল। বন্ধুত্বের উপর যখন বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল তখনই তার পরিচয় হয় অনিমেষের সাথে। সাধারণ বন্ধুর মতই তাদের জীবন চলছিল। কথাবার্তা,গল্প...অনেক গল্প চলতে থাকে। অনিমেষের খুব ভাল লাগত তবাস্মির সাথে গল্প করতে,সবসময় তার খোঁজ নিত। তবাস্মির সকল সমস্যা বুঝতে চেষ্টা করত ও তা সমাধান করে দিত। তবাস্মিকে তার মনের সব কথা বলত। একসময় তবাস্মি বুঝতে পারল যে অনিমেষ তাকে খুব ভাল বোঝে। অনেক দুঃখের কথা তবাস্মি না বললেও অনিমেষ তা সঠিক অনুমান করে ফেলত ও সকল পরিস্থিতিতে তার সাথে থাকত। এভাবেই গড়ে উঠল তাদের বন্ধুত্ব।

তবাস্মি তার নিঃসঙ্গ জীবনে বন্ধু খুঁজে পেল । অনিমেষও তবাস্মিকে পেয়ে তার একাকীত্ব ভুলে গেল । অনিমেষের সাথে বন্ধুত্ব হওয়ার আগে তবাস্মি ডায়েরী লিখত । তবে এখন আর সে লেখে না কারণ অনিমেষই এখন তার ডায়েরী । প্রতিদিন যা হয় বা তার মনের সব কথা সে অনিমেষকে বলে । অনিমেষও এতে খুবই খুশি হয় । কত হাশি-কান্না,মজা,আবেগ জড়িয়ে আছে তাদের বন্ধুত্বে!! তবাস্মি বলে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা অনিমেষকে তার জীবনে পাঠিয়েছে । অনিমেষ তা শুনে হাসে,নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করে। অনিমেষ ও তবাস্মির কোনো মনের মানুষ নেই। তাই তারা মনে মনে কল্পনা করত কেমন হবে তাদের ভালবাসার মানুষটি! তবাস্মি কল্পনা করত তার রাজকুমারকে নিয়ে! প্রিন্স!! আর অনিমেষের স্বপ্নকন্যা! প্রায়ই দুজন তাদের নিয়ে কল্পনা করত। এ রকম কত্ত মজার স্মৃতি! এভাবেই চলে গেল এক বছর।

ধীরে ধীরে তবাস্মির জন্য অনিমেষের মনে ভাল লাগা সৃষ্টি হতে থাকল। তবাস্মিকে বন্ধুর চেয়ে বেশি ভাবতে শুরু করল। তবে মুখ ফুটে বলতে পারে না। সে ভাবত তার প্রিয় বন্ধুটি যদি তা শুনে মন খারাপ করে বা অভিমান করে!?! ভয় পেত যদি তবাস্মি তাকে ছেড়ে চলে যায়। অনিমেষের এ পরিবর্তন তবাস্মি বুঝতে পারে। স্বপ্নকন্যাকে নিয়ে গল্প করার সময় অনিমেষ যেন আনমনা হয়ে যায়। অনিমেষ তবাস্মির অনুভূতির আরও কাছে চলে যেতে থাকে। তবাস্মি মাঝে মাঝে মন খারাপ করে থাকত যে হয়ত কাউকে সে ভালবাসতে পারবে না। কারণ ভালবাসা কি তা সে বোঝে না।একদিন অনিমেষ বলেই ফেলল-

-জানিস তোর দুঃখ আমার একদম ভাল লাগে না। তোকে খুব ভালবাসতে ইচ্ছা করে।

-মানে?? মজা করছিস??

-না...মানে...মজা না।

প্রায় অপ্রস্তুত হয়েই তবাস্মি বলে,আমাকে ভালবাসিস??’

-হুম.........

-মানে?? কি??!!

-প্লিজ মন খারাপ করিস না তবাস্মি...

-কিন্তু...কিন্তু...কবে থেকে??

-আমি জানি না... তবাস্মি ...আমি......আমি তোকে ভালবাসি...

ইতস্তত করে আবার অনিমেষ বলল-‘আমাকে ভালবাসবি??’

-না............

-হুম...ইটস ওকে...

দু’জন অনেকক্ষণ চুপ। তবাস্মি নিরবতা ভাঙল।

-দেখ, আমি এভাবে কখনো ভাবিনি। তুই শুধু আমার প্রিয় বন্ধু। আর...আর...আমি ভালবাসতে পারি না...

-ইটস ওকে তবাস্মি।আমি কখনো জানতে চাইব না তুই আমাকে কেন ভালবাসিস না। শুধু আমাকে কখনো ছেড়ে যাস না। আমার প্রিয় বন্ধু হয়ে থাকিস, থাকবি তো?

-থাকব......

তবাস্মি তখনো অবাক হয়ে ছিল। তার প্রিয় বন্ধু এখন শুধু প্রিয় বন্ধু নইয়,তাকে ভালবাসে। কেউ এখন তাকে ভালবাসে,বারবার মনে হচ্ছিল তবাস্মির।অন্য কেউ তাকে এ কথা বললে সে হয়ত রাগ করত,তার সাথে কথা বলত না। তবে অনিমেষ তো আলাদা। এত প্রিয় বন্ধুর উপর রাগ করতে পারে না তবাস্মি। তাই তার কাছ থেকে দূরেও যাবে না। তবাস্মির খুব কষ্ট হতে থাকে কারণ তার বন্ধুকে সে ভালবাসে না। বন্ধুর কষ্টে সে কষ্ট পায়। সেদিন রাতে খুব কষ্ট পেয়েছিল তবাস্মি। অনিমেষের কষ্ট সে সহ্য করতে পারে না। ওদিকে অনিমেষ কষ্ট পেলেও খুশি হয় এই ভেবে যে তবাস্মি তার সাথে আগের মতই আছে। একটুও রাগ করে নি বরং তাকে বুঝিয়েছে। এ বন্ধুত্তের ভালবাসা পেয়েই অনেক খুশি অনিমেষ।

এভাবে কয়েক মাস কেটে যায়। অনিমেষ আর তবাস্মির বন্ধুত্তে আরও গভীর হয়। তবাস্মির সব দুঃখ কষ্ট অনিমেষ নিয়ে নেয়। তবাস্মির একটু কষ্ট হলেই অনিমেষ কেঁদে ফেলে আর তবাস্মি অনিমেষের কষ্টে কেঁদে ফেলে। তবাস্মি কখনো অনিমেষকে তার ভালবাসা প্রকাশ করতে বাধা দেয়নি কারণ সে অনিমেষকে কষ্ট দিতে চায়না। অনিমেষ প্রায়ই তবাস্মিকে বলে যে তাকে পেলে সে কিভাবে তাদের ভবিষ্যত সাজাবে। তবাস্মিও আনন্দের সাথে তা শুনে এবং তার কল্পনায় যোগ দেয়। অনিমেষের তাকে নিয়ে সাজানো কল্পনা তার কাছে খুব সুইট লাগে!

এমন না যে তবাস্মি কাউকে ভালবাসে। তবে তবাস্মির পরিবারে সবসময় মা-বাবার পছন্দে বিয়ে করার কথা বলা হয়। তবাস্মিতার মা-বাবাকে খুব ভালবাসে। তাই সে চায় না যে কাউকে ভালবেসে তার মা বাবাকে কষ্ট দিতে।এছাড়াও তার ভয় হয় সে যদি কাউকে ভালবাসে আর তার মা-বাবা মেনে না নেয় তবে সে কিভাবে বাঁচবে। তাই সে ভালবাসা নিয়ে চিন্তা করে না। সে তার প্রিয় বন্ধুকে পেয়েই খুশি। অনিমেষের সঙ্গ তার সব একাকীত্ব ভুলিয়ে দেয়। অনিমেষকে ভালবাসবে-এ কথা ভাবলেই তার মাথা যেন আউলিয়ে যায়!! সকল বাধা তার সামনে চলে আসে। মাঝে মাঝে সে খুব কষ্ট পায়। তবে প্রকৃত অর্থে সে অনিমেষের প্রতি ভালবাসা অনুভব করে না।

অনিমেষ তার বন্ধুত্ব আর ভালবাসা দিয়ে তবাস্মির জীবন ভরিয়ে দিতে চায়। তবে পুরোপুরি ভালবাসা সে প্রকাশ করতে পারে না কারণ সে জানে যে তবাস্মি তাকে শুধু বন্ধুর মতই ভালবাসে। তবুও সে খুশি কারণ তবাস্মি তার ভালবাসা বোঝে,তাকে বিশ্বাস করে,কখনো তাকে কষ্ট দেয় না। তার কষ্ট হয়ে তবাস্মি তার সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয় আর সবসময় তার পাশে থাকে। দুজন দুজনকে কখনো ছেড়ে যাবে না। অনিমেষ যতটুকু ভালবাসা প্রকাশ করতে পারে তাতেই খুশি হয়। সে নিজেকে খুব ভাগ্যবান বলে মনে করে কারণ এমন বন্ধু কয়জনই পায়!! এভাবেই অনেক দিন চলতে থাকল। একদিন অনিমেষ তবাস্মিকে বলল,

-তুই কি কখনো আমাকে ভালবাসবি না?

-ভালবাসব......

-কবে?!!!

-বিয়ের পর! বলেই হেসে ফেলে তবাস্মি। আবার বলল, ‘আমাকে বিয়ে
করবি?’

-অবশ্যই করব!

-হুম। যখন সময় আসবে তখন আমার মা-বাবাকে বলিস। তারা যদি মেনে নেন তবে আমার কোন সমস্যা নাই।

-সত্যি???!!

- সত্যি অনিমেষ!

-তাহলে ভবিষ্যতে সময় আসলে আমি তোর মা-বাবার কাছে প্রস্তাব পাঠাব।

-তবে আমার আরও একটা শর্ত আছে।

-কি?

-আমি যদি অন্য কাউকে ভালবেসে ফেলি??

-ও............হুম.............
..

-তুই খুব কষ্ট পাবি,তাই না রে??

-না রে...তুই খুশি হলেই আমি খুশি...

মনের অজান্তেই তবাস্মির চোখ পানিতে ভরে উঠল।

তবাস্মি মাঝে মাঝে ভাবে যে তার জীবনে বন্ধুর জন্য সে কত প্রার্থনাই না করেছে। সৃষ্টিকর্তা কতটা দয়াময় যে তিঁনি তাকে প্রকৃত বন্ধু দিয়েছেন আর সে বন্ধু তাকে এতটা ভালবাসে যা সে আগে কখনো কল্পনাও করতে পারে নি। অনিমেষ তবাস্মিকে নিয়েই তার ভবিষ্যতের স্বপ্ন সাজায়। সে জানে হয়ত তবাস্মি অন্য কারও হয়ে যেতে পারে তবুও সে তবাস্মিকে ভালবাসে আর ভালবাসবে। তবাস্মিকে ছাড়া কখনো আর কাউকে ভালবাসবে না সে।

মাঝে মাঝে তবাস্মি বলে যে সে তার না হলে অন্য কোনো মেয়ে তার জীবনে আসবে যে তাকে অনেক অনেক ভালবাসবে আর সে তার চেয়েও অনেক ভাল হবে। আবার মাঝে মাঝে সে বলে যে সে নিজেই অনিমেষের জন্য খুব ভাল একজনকে খুঁজে নিয়ে আসবে। এসব কথা শুনে খুব রাগ ও অভিমান হয় অনিমেষের। সে আবেগজড়িত কণ্ঠে বলে- তোকে ছাড়া আমি আর কাউকে চাই না রে...চাইব ও না। আমি শুধু তোর......

বিয়ের বয়স হতে তাদের এখনও অনেক সময় বাকি। পড়াশুনা...এখনওতো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি তারা। বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে আরও উচ্চশিক্ষা নিতে নিতে এখনো বিয়ের জন্য ১০/১২ বছর রয়েছে। অনিমেষ কল্পনায় ১০/১২ বছর পর তার কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনে যেখানে শুধু সে আর তবাস্মি। তবাস্মি আর অনিমেষ কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারে না। প্রতিদিন তাদের কথা হয়। যখনই সময় পায় তারা গল্প করে। কত গল্পই না তারা করে......

-তোর বিয়ের পর তোর বর যদি আমার সাথে তোর বন্ধুত্ব পছন্দ না করে?

-উহ! বললেই হলো?? যে আমার প্রিয় বন্ধুকে পছন্দ করবে না তাকে আমি কখনো বিয়ে করব না!

হেসে ফেলে অনিমেষ । -আমি সারাজীবন তোর প্রিয় বন্ধু হয়ে থাকব অনিমেষ;

-জানি রে...এই জন্যই তো আমি বেঁচে আছি...

-আমি অন্য কারো হলে তুই খুব কষ্ট পাবি তাই না অনিমেষ?

-আমি বলেছি তো তোর খুশিতেই আমি খুশি...

-কাঁদবি না তো? দেখ, তুই কাঁদলে কিন্তু আমি কাউকে ভালবাসলেও তোকে বলব না।

-না না! প্লিজ আমাকে বলিস।

-বলবো বলবো...তবে সে যদি আমাকে ভালো না বাসে??

-আমি তোকে সাহায্য করব।

-কি???!!!!! অন্য কাউকে ভালবাসতে তুই আমাকে সাহায্য করবি??!!

-হ্যাঁ...করবই তো। আমি তোর বেষ্ট ফ্রেন্ড না??

নিশ্চুপ হয়ে যায় তবাস্মি...-তুই কেন আমাকে এত ভালবাসিস?

-আমি তোকে ভালবাসতে ভালবাসি তবাস্মি...।

-আমি অন্য কারও হলে তুই কেন অন্য কাউকে ভালবাসবি না??

-কেন তুই বুঝিস না যে আমি শুধু তোকে ভালবাসি...এমন তো না যে
ভালবা।সা পাওয়ার জন্য আমি মরে যাচ্ছি বা তো কে না পেলে আমি আত্মহত্যা করব... তুই আমার হলে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষ হব আর তা না হলে তোর ভালবাসার মানুষের সাথে তুই সুখী থাকলেই আমি খুশী। আমার জীবনটা এভাবেই কেটে যাবে...

তবাস্মির চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে পড়ে আর অনিমেষের এই ভালবাসায় তার মুখে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে।

-কাঁদছিস কেন? প্লিজ কাঁদিস না তবাস্মি...

অনিমেষ তার চোখ মুছে দেয়।

-তুই দেখে নিস অনিমেষ...আল্লাহ আমাদের জীবনে এমন কিছু ঘটাবেন
যাতে আমরা দুজনই ভাল থাকি।

-হুম......তাই যেন হয়। তবে অন্য কেঊ তোর জীবনে আসলে তোর উপর
আমার কোন দাবি থাকবে না। তবে ততদিন পর্যন্ত তুই শুধু আমার হয়ে থাকবি...থাকবি তো?

-হ্যাঁ অনিমেষ...আমি শুধু তোর হয়ে থাকব...আমি তুই শুধু আমার...

অনিমেষ হেসে বলে- আর কার??

-শুধু আমার...শুধু আমার......

দুজনই হেসে ফেলে। এভাবেই চলছে তাদের জীবন। অন্য রকম ভালবাসা সৃষ্টি হয়ে গেছে তাদের মাঝে...ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা জেনেও তারা তাদের স্বপ্ন বুনে যাচ্ছে...এখন শুধু ১০/১২ বছর পার হবার প্রতীক্ষা...

হৃদিতা ও তার বাবা


হৃদিতা আজকে অনেক খুশি। এতই খুশি যে রাক্ষসী ম্যাডামের ক্লাস করতেও আজকে তার খুব ভাল লাগছে। রাক্ষসী ম্যাডামের আসল নাম রাবেয়া খাতুন, কিন্তু তার রাক্ষসী মার্কা স্বভাব এর জন্য ক্লাসের সব মেয়েরা মিলে তার নাম দিয়েছে রাক্ষসী ম্যাডাম। এই ম্যাডামের ক্লাসের ৪০মিনিট পার করা মেয়েগুলোর জন্য রীতিমত নরক যন্ত্রণা !! কিন্তু আজকে হৃদিতার মনে হচ্ছে, “নাহ !! রাক্ষসী ম্যাডামটা আসলে এত খারাপও না !!”

দুপুর ১২টা বেজে ২০মিনিট এ হৃদিতার স্কুল ছুটি হল। দারোয়ান চাচা ঘন্টাটা বাজানোর সাথে সাথে হৃদিতার মনে হল এক ছুটে ক্লাস থেকে বের হয়ে গেটের কাছে চলে যায় সে। আর তাই ক্লাস থেকে ম্যাডাম বের হওয়া মাত্র ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে পানির ফ্লাস্কটা হাতে নিয়ে এক দৌড় দিল সে, এক দৌড়ে একদম গেটের সামনে। আর সেখানে গিয়েই দেখল তার বাবা দাঁড়িয়ে আছে, হাতে একটা বড় ডেইরী মিল্ক, অনেক বড়টা। কি মজা, খুশিতে হৃদিতা বাবার কাছে গিয়ে তার গালে একটা চুমু দিল। আজকে তার খুব আনন্দের দিন। প্রতি মাসে এরকম একটা দিন তার বাবা তাকে স্কুল থেকে নিতে আসে। সেদিন তারা দুজন সারাদিন ঘোরে, আর তারপর সন্ধ্যাবেলা বাবা তাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে চলে যায়। তারপর আবার এক মাস বাবার চেহারাটা দেখা হয়না বাচ্চা মেয়েটার।

হৃদিতার বাবা ফরহাদ হোসেন বেশ হাসিখুশি মানুষ। মজার মজার গল্প করতে পারার কারণে যেকোন জায়গায় গেলে অল্প সময়ের মধ্যেই আড্ডার মধ্যমণি হয়ে যান সহজেই। এভাবেই এক বিয়ের অনুষ্ঠানে শাহানার সাথে পরিচয় তার। পরিচয়ের অল্পদিনের মাথায় পরিণয়, এবং অতঃপর বিয়ে। বিয়ের ২বছরের মাথায় জন্ম হয় হৃদিতার। আর তার কিছুদিন পর থেকেই তাদের মধ্যে মনোমালিন্যের শুরু। ছোটখাট বিষয় নিয়ে টুকটাক কথা কাটাকাটির এই শুরুটা বছর চারেকের মধ্যে শেষ হয় ডিভোর্সের মধ্য দিয়ে। আর আইন এর কথামত হৃদিতার কাস্টডি পান শাহানা। ছোটবেলা থেকেই বাবা-মেয়ের বন্ধুত্বটা অনেক ভাল থাকায় ফরহাদ সাহেব আর হৃদিতা দুজনেরই খুব কষ্ট হয় আলাদা থাকাতে। আর এজন্যই শাহানার অনুমতি নিয়ে প্রতি মাসের একটা দিন ফরহাদ সাহেব হৃদিতাকে নিজের কাছে রাখেন। সেদিন হৃদিতার স্কুল ছুটির পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরোটা সময় তিনি মেয়ের সাথে কাটান। এসময়টায় ফরহাদ সাহেব শুধুই একজন বাবা, নিজেকে দৈনন্দিন জীবনের বাকি সব সম্পর্কের বেড়াজাল থেকে একদম মুক্ত করে শুধুমাত্র হৃদিতার বাবা হয়ে কাটান তিনি মাসের এই একটা দিন। আর হৃদিতার চেষ্টা থাকে বাবার সাথে এমন সব আনন্দ করা যাতে সামনের একটা মাস যখন বাবাকে অনেক মিস করবে সে তখন যেন এই সময়গুলোর কথা মনে করে কান্না থামাতে পারে সে। আর আজকেও তেমন একটি দিন। শুধুমাত্র পিতা এবং কন্যার দিন।


স্কুল থেকে বের হয়ে ফুটপাথ ধরে বাবার সাথে হাঁটছে হৃদিতা। ডান হাত দিয়ে বাবার বাম হাতের তর্জনীটা ধরে আছে সে। সবসময় এভাবেই ধরে সে বাবার হাত। শুধু তর্জনী। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একটা ফুচকার গাড়ি দেখে দাঁড়িয়ে গেল হৃদিতা। “বাবা, ফুচকা খাব।” বাইরের খাবার খাওয়ার ব্যপারে মেয়ের উপর কঠিন নিষেধাজ্ঞা হৃদিতার মায়ের। এজন্যই এসব খাবারের আবদার ভয়েও সে মার কাছে করেনা। বাবাকে একদমই ভয় পায় না হৃদিতা। তার বাবা অনেক ভাল। কখনো না করে না কোন কিছুতে। আসলে এই একটা দিন মেয়েকে খুব হাসিখুশি দেখতে চান ফরহাদ সাহেব, তাই মেয়ের কোন আবদারই অপূর্ণ রাখেন না। তাই বাবা-মেয়েতে মিলে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে বেশ মজা করে ফুচকা খেলেন তারা। এরপর মেয়েকে নিয়ে রিক্সায় উঠলেন তিনি। এই দিনের বেশ অনেকটা সময় তারা দুজন রিক্সা করে ঘুরে বেড়ান। আর এই রিক্সা ভ্রমণের মাঝে চলতে থাকে ফরহাদ সাহেবের আইকিউ টেস্ট। “বাবা তুমি কি জান আইনস্টাইন কে?” “বাবা তুমি কি জান মানুষ আগে বানর ছিল?” “বাবা তুমি কি বলতে পারবা রংধনুতে যে রঙ গুলা থাকে সেগুলা কি কি?” এভাবে গত একমাসে নিজের অর্জিত সকল বিদ্যা বাবাকে মহা উৎসাহে প্রদর্শন করে হৃদিতা। আর ফরহাদ সাহেব এমনভাবে অবাক হবার ভঙ্গী করেন, যেন হৃদিতা না বললে এত কিছু কখনোই জানতেন না তিনি। আর এতে নিজের জ্ঞানের সম্ভারে তৃপ্ত হৃদিতার মুখে বিজয়ীর যে হাসি ফুটে ওঠে তা দেখে আনন্দ পান তিনি। দুপুরের দিকে মেয়েকে নিয়ে একটা চায়নিজ রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করলেন ফরহাদ সাহেব। হৃদিতার চায়নিজ ফুড খুব পছন্দ। চায়নিজে বসে চিকেন ফ্রাইয়ে কামড় বসানোর ফাঁকে ফাঁকে গত এক মাসে স্কুলে কি কি হল যথারীতি সব বাবাকে বলা শুরু করলো হৃদিতা। “জান বাবা আমাদের রাক্ষসী ম্যাডাম না সেদিন একটা মেয়ের আঙ্গুলের ফাঁকে পেন্সিল ঢুকিয়ে জোরে চাপ দিয়ে শাস্তি দিল। মেয়েটা এত কাঁদল জান বাবা।” “বাবা তোমাকে বলেছিলাম না যে আদৃতা একটা খেলনা পুতুল কিনেছিল, যেটা হ্যাপী বার্থডে গান গাইতে পারে, সেটার মাথাটা না ওর ছোট ভাই আকিব ভেঙ্গে দিয়েছে। আর তাই আদৃতা রাগ করে আকিবের বল জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছে।” “বাবা জান অরিনের আম্মু না রেজাল্ট খারাপ করায় রাগ করে বাসার ডিশের লাইন কেটে দিয়েছে, অরিন এখন আর কার্টুন দেখতে পারে না।” “বাবা আমার যে একটা লাল চুলের ব্যান্ড ছিল না? সেটা না হারিয়ে গিয়েছে স্কুলে বরফ-পানি খেলার সময়।” এভাবে নিজের সারা মাসের সব গল্প এই ফাঁকে বাবাকে বলে ফেললো হৃদিতা। এরপর বিকেল বেলা বাবার সাথে মুভি দেখতে গেল। “আমার বন্ধু রাশেদ”। বইটা বাবা তাকে ২মাস আগে কিনে দিয়েছিল। বইটা পড়ে অনেক কেঁদেছে হৃদিতা। রাশেদের জন্য এত্ত বেশি খারাপ লাগছিল যে পরের ৩দিন মন খারাপ হয়ে ছিল তার। আজকে যখন বাবা বললো যে এই গল্পটা নিয়ে মুভি হয়েছে আর আজকে তারা সেটা দেখতে যাবে, হৃদিতা চিন্তায় পড়ে গেল। সিনেমা হলে সবার সামনে কান্নাকাটি করলে বাবা ভেঙ্গাবে না তো তাকে? চিন্তার বিষয়!! কান্নাকাটি করলে বাবা তাকে খুব ভেঙ্গায়। কিন্তু তবুও সে দেখতে যাবে। বাবার পাশে বসে বাবার হাতে পপকর্ণ খেতে খেতে মুভি দেখা, ইস কতদিন যে এমন ভাবে সময় কাটানো হয় না তার!! এটা ভেবে আবার কান্নাকাটির দুঃশ্চিন্তা চলে গেল তার। এরপর দুজন মিলে সন্ধ্যা পর্যন্ত মুভি দেখে যখন বের হয়ে রিক্সা নিল তখন হৃদিতার চোখে পানি। নাহ, রাশেদের জন্য কাঁদছে না সে। বাবার সাথে কাটানোর জন্য বরাদ্দ আজকের সময়টা শেষ। এটা ভেবেই বারবার কান্না চলে আসছে তার। আর সে সমানে চেষ্টা করে যাচ্ছে যাতে বাবা চোখের পানি দেখতে না পায়। তাহলে আবার তাকে ভেঙ্গাবে দুষ্ট বাবাটা। বলবে, “আমিতো জানতাম আমার মেয়ে অনেক ব্রেইভ, অনেক স্ট্রং। সে একদম কান্নাকাটি করে না। এখন তো দেখছি সে তার ফ্রেন্ড মিতুর মত একটুতেই ভ্যা করে কেঁদে দেয়।” কেমন লাগে কথাটা শুনলে? মিতু হল তাদের ক্লাসের সবচেয়ে বোকা মেয়ে, একদম হাবা টাইপ। কেউ কিছু বললেই ভ্যা করে কেঁদে দেয়। আর বাবা কি না বলে সে মিতুর মত? ছিঃ ছিঃ কি লজ্জা !! এই লজ্জার ভয়েই বাবার সামনে কাঁদে না হৃদিতা। ফরহাদ সাহেব সবসময় একটা কাজ করেন এই সময়টায়। হৃদিতা যখন প্রতিবার যাবার বেলায় কেঁদে দেয় এবং নানান কায়দায় সেই কান্না লুকানোর চেষ্টা করে তিনি এমন একটা ভাব করেন যেন তিনি আসলেই দেখতে পান নি মেয়ের চোখের পানি। আর সেই ফাঁকে নিজের চোখটাও মুছে নেন। মেয়েটাকে আবার এক মাস দেখতে পারবেন না এটা মনে হলেই চোখ ভিজে যায় তার। “আইন গুলা কেন এমন?” “বাচ্চা কেন সবসময় মার কাছেই থাকবে?” “বাবারা কি বাচ্চাদের ভালবাসে না?” ছেলেমানুষি এইসব প্রশ্নের জবাব খুঁজতে থাকেন তখন তিনি। নাহ, জবাব কখনোই পান না।


হৃদিতার বাসা এসে গেছে। ইস, বাসাটা এত কাছে কেন তাদের? রাস্তায় কেন একটু জ্যাম পড়ল না? কেন রিক্সার চাকাটা নষ্ট হয়ে গেল না? এসব কথা মনে হয়ে আবারো হৃদিতার চোখ ভিজে যাচ্ছে। এখনি তাকে বাসায় উঠে যেতে হবে, বাবা তাকে সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে চলে যাবেন। এরপর আবার এক মাস বাবার সাথে দেখা হবে না তার। এসব ভাবতে ভাবতে বাবার তর্জনীটা ধরে সিঁড়ি পর্যন্ত গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরলো হৃদিতা। বাবার গালে একটা চুমু খেয়ে বললো, “বাবা তুমি ভাল থেক। আমার জন্য একদম চিন্তা করবে না। আমি অনেক ভাল থাকব। ঠিকমত পড়াশোনা করবো। প্রতিদিন দুধ খাব। আর একদম মিতুর মত করে কান্নাকাটি করবো না। আমি তোমার ব্রেইভ গার্ল বাবা, সত্যি !!” ফরহাদ সাহেব মিষ্টি করে হেসে মেয়ের কপালে চুমু দিলেন একটা। মেয়েটা এত মিষ্টি হয়েছে। ইচ্ছে করছে আরো একবার জড়িয়ে ধরতে, কিন্তু তিনি ধরবেন না। মেয়েটা আরো কাঁদবে তাহলে। তার নিজেরও কান্না পাচ্ছে খুব। তিনি চান না হৃদিতা তাঁর চোখের পানি দেখুক। মেয়েকে আর কিছু না বলে উল্টা দিকে ফিরে হাঁটা দেন তিনি। রাস্তায় বের হবার কিছুক্ষণ পরেই ঝুম বৃষ্টি নামলো। বৃষ্টি দেখে খুশি হয়ে গেলেন ফরহাদ সাহেব। রাস্তার কেউ তাঁর দিকে তাকিয়ে কিছু বুঝবে না এখন। কেউ আর তাকে দেখে মনে মনে ভাববে না “কি ব্যপার? এই লোকটা কাঁদছে কেন??”

দেশে ফেরা


মিডেলইস্ট হয়ে দেশে ফেরা আমার কক্ষনো ভাললাগে না। কিন্তু কি আর করা। প্যাসিফিক পাড়ি দেয়া বিমানগুলোর গগণচুম্বি ভাড়া বাধ্য করে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে তেলের দেশে থেমে বাড়ি ফিরতে। দুবাই এয়ারপোর্টে নেমেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। হিউস্টন থেকে পনের ঘন্টা দুইহাত বাই দেড়হাতের সংকীর্ণ জায়গায় বন্দী থেকে, অসার হাত-পা নিয়ে কোনমতে নেমে শুনি ঢাকাগামী প্লেন ঘন্টা তিনেক লেট। দু-ঘন্টা লেওভার মিলিয়ে পাঁচ ঘন্টা অহেতুক বসে থাকতে হবে। মার আদর, শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে চিরচেনা মা মা গন্ধের নির্ভরতা, সব কষ্ট মুছে দেয়া মৃদু-হাসিমাখা বাবার প্রশ্রয়ি মুখ আর মাত্র ছয় ঘন্টা দূরে—এই বলে প্লেনের শেষ অসহ্য প্রহরে নিজেকে শান্তনা দিয়েছি। এখন এই বাজারি-আলো ঝলমলে ডিউটিফ্রির দাবানলে দগ্ধ হতে হবে, ভাবতেই পাগল পাগল লাগছিল। হতদরিদ্র হতভাগ্য গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট আমি, পকেটে নেই কানাকড়ি, সবচেয়ে সস্তা এয়ারলাইনের ইকোনমি ক্লাসের ভাড়া জোগাড় করতেই হিমশিম--নইলে বেশ বাজারসদাই করে সময় পার করা যেত! তবু সময় কাটানোর জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম।

দুবাই যেন সাউথ-ইন্ডিয়ানদের ঘরবাড়ি-রঙিন শাড়ির সাথে কেডস আর লম্বা বেনীতে সাদাফুল গোজা, অনেক সোনায় মোড়া প্রতিবেশীদেশের সুকন্যাদের দেখে অবাকই হচ্ছিলাম। বৃদ্ধা, প্রৌড়া, তরুনী সকলেরই একই সাজ। মাথা নেড়ে নেড়ে তামিল ভাষায় কিচিরমিচির করে কি যে খোশগল্প ওদের। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যাধুনিকা, মডেলসমা বান্ধবীরা থাকলে অর্থপূর্ণ, ঈঙ্গিতময় কটাক্ষে একে অন্যকে বলত, “এমা দেখেছিস, কি ক্ষ্যাতরে বাবা!” আমি অবাক বিস্ময়ে এই প্রথম লক্ষ্য করলাম নিজেদের সংস্কৃতি আর জাতিগত পরিচয়কে আকঁড়ে ধরে গর্বের সাথে সারা বিশ্বকে দেখানোর এমন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আর আমরা? এখন নিঁখাদ বাংলায় একটানা পাঁচ মিনিট কথা বলা মানে, নট কালচারড এনাফ, নট ওয়েল ভারসড ইন দা ল্যাংগুয়েজ দ্যাট ম্যাটারস, অর্থাৎ সোজা বাংলায় অশিক্ষিত! গড়্গড়িয়ে ইংলিশ না বলতে পারলে নিদেনপক্ষে ব্যাংলিশ বলাটাই আজ ফ্যাশন। দেশের বাইরে পা দেয়া মাত্র জিন্স আর টিশার্ট বা ফতুয়াতে সুইচ করতে হয়, কমফোর্ট এন্ড ব্লেন্ডিং ইন যে খুব ইম্পর্টেন্ট! সাধারণ সুতিশাড়ি, টিপ, রেশমি চুড়ি পড়বার কথা ভাবলেই গায়ে জ্বর আসে আজকাল আমাদের। পার্টি ছাড়া কেউ শাড়ি পড়ে নাকি প্রবাসে। ওদের রঙে রঙ মেলানোর, জাতে উঠাবার কি আপ্রাণ প্রচেষ্টা আমাদের। হায়রে!

এসব আবোল তাবোল ভাবতে ভাবতে ঘুরতে ঘুরতে এক এরাবিয়ান সুভেনিরের দোকানে ঢুকে দেখি এক দক্ষিন ভারতীয় “আম্মা” একটা জেসমিন পারফিউমের দাম নিয়ে ফিক্সড প্রাইসের দোকানে অত্যুৎসাহে দামাদামি করার চেষ্টায় নিয়োজিত! আমি এগিয়ে গিয়ে পারফিউমের টেস্টার বোতল পরখ করে, আর দাম দেখে রীতিমত পাগলপারা হয়ে গেলাম। মার জন্য এর থেকে ভাল উপহার আর কিছুই হতে পারে না। দামও নাগালের মধ্যে। যখন ছোট ছিলাম, হাল্কা হাস্নাহেনার এই সুরভিতে সজ্জ্বিতা মা আমাকে নিয়ে বেড়াতে যেতেন খালার বাসায়—আমার স্পষ্ট মনে আছে। রিক্সায় মার পাশে বসে মায়ের গায়ের গন্ধ শুকতাম প্রানভরে। এখন ঢাকায় এটা আর পাওয়া যায় না। একই নামে মাথা ধরিয়ে দেয়া ঝাঁঝালো যে দূর্গন্ধি (সুগন্ধির একদম বিপরীত মেরুর বাসিন্দা) পাওয়া যায়, তা নকল বৈ কিছু নয়। খুবই ফুরফুরে মনে (দামাদামি না করেইঃ)) কিনে নিয়ে বেড়িয়ে এলাম হতাশ চেহারার দক্ষিনি “আম্মার” সামনে দিয়ে! ৬ ডলারের জিনিষ ৫ ডলারে কেনার চেষ্টা করিনি বলে মনে মনে গাল দিয়েছেন কিনা কে জানে। এত টায়ার্ড লাগছিল। ঠিক করলাম, আর ঘুরাঘুরি নয়, আমার গেইটের সামনে গিয়ে বসে থাকব।

ঘড়ির কাটা যেন ঘুরতেই চায় না। পাঁচ ঘন্টা ঘুরতে কাটার কম-সে-কম দশ ঘন্টা লাগল। বোর্ডিং এর জন্য ডাক এল অবশেষে। সাথে সাথে রীতিমত হাঙ্গামা লেগে গেল। জোন অনুযায়ী বোর্ডিং হবার কথা। কিন্তু কিসের কি। সবাই এক সাথে যেতে চায় নিয়মকে বুড়ো-আঙ্গুল দেখিয়ে। কেন যে আমরা এমন! ঊফফফ! এয়ারলাইনের কর্মীরাও হাল ছেড়ে দিলেন। “আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে” বোর্ডিং হল। ঠেলাঠেলি করতে না পেরে সবার শেষে ধৈর্যের চরম পরীক্ষা দিয়ে প্লেনে ঊঠলাম, নিজের আসনের কাছে গেলাম, গিয়েই মনটা ভয়াবহ রকমের খারাপ হয়ে গেল। ভাগ্যের একি পরিহাস! আমার পড়েছে মাঝের সিট। মানে হল সারারাস্তা এলার্ট হয়ে, জড়োসড়ো হয়ে কাটাতে হবে, বের হওয়ার, হাটাহাটি করার বা ঘুমানোর ---কোনটারি আশা নেই।

সহযাত্রীদ্বয়কে দেখে মনে হল মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের রপ্তানীকৃত সৌভাগ্যবান জনশক্তির অংশ। আইলসিটের দেশীভাইটি বত্রিশ দন্ত বিকশিত করে স্বাগত জানালেন, উঠে আমাকে বসার জায়গা দিয়ে বল্লেন, “সিস্টার ইঊ বাংলাদেশী?” উনি আমার ক্যারি-অন ঊপরে তুলে দিলেন। প্রতিদানে আমি একগাল হেসে উনার প্রশ্নের উত্তরে মাথা নাড়িয়ে নিজের আসনে কোনমতে বসতেই নাসিকারন্ধ্র বেয়ে আসা তীব্র কটুগন্ধের আক্রমনে দিশাহারা হয়ে গেলাম। মোজার উৎকট গন্ধ! ডাক ছেড়ে তখন “ওরে মারে বাবারে” বলে কাঁদতে ইচ্ছা করছিল। কি করব এখন আমি? আগামী সাড়ে চার ঘন্টা থাকব কি করে? জানালার পাশের মধ্যবয়সি ভদ্রলোক অনির্মেষ তাকিয়ে আছেন বাইরের ঘন অন্ধকারের দিকে, হাতে শক্ত করে একটি পার্সের মত ব্যাগ আঁকড়ে আছেন—তার বেদনাক্লিষ্ট মুখের দিকে তাকিয়ে উনাকে আমার সাথে সিট বদলের অনুরোধ করারও সাহস পেলাম না।

সারাজীবন দেখেছি কিছুক্ষন পরে যেকোন কড়া গন্ধ সহনীয় হয়ে যায়—কিন্তু মোজার গন্ধের তীব্রতা যেন বেড়েই যেতে লাগল--বমি বমি লাগতে শুরু করল। হঠাৎ আর্কিমিডিসের মত ইউরেকা বলে চেঁচানোর লোভ সম্বরন করে নুতন আইডিয়াকে কাজে লাগাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আমার সিটের উপর রাখা কম্বলের প্লাস্টিকের মোড়ক হ্যাচকা টানে চটজলদি খুলে, মার জন্য কেনা পারফিউমের রপিং সাবধানে খুলে ফুস-ফুস করে ছড়িয়ে দিলাম হাস্নাহেনার সৌরভ কম্বলের পরতে পরতে। যে মহামনিষী বলেছিলেন “প্রয়োজন আবিষ্কারের জননী”, তার বুদ্ধি আসলেই ভাল ছিল, আমারটাও নেহাত খারাপ না—এই খুশীতে খানিক আত্মশ্লাঘায় ভুগে আপাদমস্তক মুড়ে ঘুমানোর চেস্টায় নিয়োজিত হলাম। ঘুমের দেশের রাজপুত্রের সাথে মাত্র চোখাচোখি হয়েছে, মদির কটাক্ষে, ওষ্ঠপ্রান্তে কুহেলিকাময় স্মিত হাসির আভাসে তাকে ভোলাব—এমন সময় আমার ডান কাঁধে তীব্র ঝাঁকুনি—“সিস্টার, ও সিস্টার, উঠেন উঠেন, খানা দিতেছে।“

হুড়মুড় করে উঠে কম্বল সরিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। আরব্য রজনীর সুন্দরী লায়লা যেন আমার সামনে দাঁড়িয়ে। “ম্যাম উড ইউ লাইক সাম থিং টু ড্রিংক?” আরবীয় টানে একি সুর-লহরী! আমার ঘোর লাগা বিহবল চেহারা দেখে আমার পাশের দেশীভাই করুনা করে আমার হয়ে বললেন, “সিস্টার নো ইংলিশ, গিভ অরেঞ্জ জুস।“ অনিদ্য সুন্দরী বিমানবালা তার কথামত কমলার রসে পেয়ালা ভরে আমার সামনে রেখে মৃদু হেসে পরের রো-তে চলে গেলেন। আমি আমার পরম উপকারী ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বেকুব মার্কা হাসি দিলাম। তখনি পিছনে শুরু হল ভয়ানক চেঁচামেচি।

ঘটনা কিছুই না। পাইলট টারবুলেন্সের আশঙ্কায় সিটবেল্ট বেঁধে বসে থাকতে বলেছেন। কিন্তু পিছনের সিটের আরেক দেশীভাই সিট ছেড়ে উঠে গিয়ে লায়লার কাছে আরেকটা কোকের ক্যান চাইলেন। লায়লা উনাকে বার বার সিটে গিয়ে বসতে বলছেন, কিন্তু ভাইসাবও নাছোড়বান্দা। লায়লা বলেই যাচ্ছে একটার বেশী ক্যান দেয়া যাবে না, সিটে গিয়ে বসতে। ভাইজান বলেই যাচ্ছেন “প্লিজ ওয়ান মোর কোক।“ অন্য আরেক বিমানবালা বেশ রাগান্বিত চেহারা করে এগিয়ে এলেন পরিস্থিতি সামাল দিতে। লায়লার চেহারায় হতাশা, বিরুক্তি, অবজ্ঞা আর ঘৃনার মিশেল। আমার কেমন যে লাগছিল। মনে হচ্ছিল ও আমাদের দেশ সম্পর্কে কিইনা ভাবছে। গরীব তলাহীন ঝুড়ির মানুষগুলা লোভী, অসভ্য, জংলী। লজ্জ্বায় মাথা কাটা যাচ্ছিল। তখনি আমার পাশের ভাই বললেন, “শালীর তেজ কত দেখলেন আপা! পয়সা দিয়া টিকেট কিনছে, কোক দিবি না ক্যান। তোর জ্যাব থেইক্যা তো দিতাছস না!”

হঠাৎ কি যে হল আমার। বুকের ভিতরের সুপ্ত আগ্নেয়গিরি যেন ফুঁসে উঠল দারুন রোষে! কাটা চামচ নামিয়ে রেখে ঠান্ডা চোখে, কঠিন স্বরে বল্লাম, “আপনার লজ্জ্বা করে না এই ভাষায় কথা বলতে? দেশের মান-সন্মান আপনাদের জন্যই ধূলাতে মিশে। এত লোভের কি দরকার। উনি জীবনে কোক খান নি? আরেকটা দিয়ে উনি কি করবেন? কি ভাবল ওরা বলেন? যে আমরা ফকির মিসকিন, লোভী। ছি ছি। লজ্জ্বায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে। ছি!”

আমার অগ্নি-স্ফুরণে চঞ্চলমতি ভাইটি মাথা নিচু করে বসে রইলেন আর আমাকে হতবাক করে দিয়ে পাশের নিশ্চুপ ভাইটি কথা বলে উঠলেন। “আফা, আমগোরে মাফ কইরা দেন। আমরা অশিক্ষিত লেবার মানুষ। করিম কোকটা নিজের জন্য চায় নাই আফা। ওর একটা চার বছরের ছেলে আছে, তার জন্য চাইছে।“

ওনাকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলাম, “যার জন্যই হোক, ভিক্ষা করা অনুচিত। দেশের মানহানি করা কত বড় অন্যায় জানেন? একজনের জন্য পুরা বাংলাদেশীদের ওরা ফকির বলবে। সেটা কি ঠিক, আপনিই বলেন?“
“আপ্নে ঠিকই বলতাছেন আফা। কিন্তু আমার কথাডা আগে হুনেন-পরে বিচার কইরেন। আমরা ব্যাকতে কুয়েতে এক কোম্পানীতে কাম কইরতাম—হাইওয়ে পরিষ্কারের কাম। এক হপ্তাহ আগে আন্ডা ব্যাকতের চাকরী গেছে গই বিনা নোটিসে। এক্কই কামের লাইগ্যা ইন্ডিয়ান গুলারে আন্ডার তুন ডাবল বেতন দেয় আরবেরা। যে বোনাসের কথা কইয়া চাকরী দিছিল, হেগিনের কিছুই দেয় ন গত চাইর বছর। আন্ডা কইছি ন্যায্য বেতন দিতে, বোনাস দিতে, নইলে অনশণ করুম, হেই লাইগ্যা আমগোরে বরখাস্ত করছে। বাসা থেইক্যা ধইরা আইনা প্লেনে তুইলা দিছে। আফা আমার পাঁচ বচ্ছরের একটা মাইয়া আছে, তারে এক বছরের থুইয়া আইছি এই দেশেথ। এই দেহেন আফা আমার আম্মার ছবি।“ তিনি তার সেই পার্স থেকে কন্যাকে কোলে নিয়ে তার স্ত্রীর একটি প্রায় দোমড়ানো, মোচকানো ছবি বার করে আমার হাতে দিলেন।

কান্নারুদ্ধ গলায় বলে চল্লেন “গত চার বছরের কামাই দিয়া ধারকর্জ শোধ দিছি। মেয়েটার জন্য কিছুই কিনবার পারি নাই আফা। বউটারেও কিছু দিবার পারি নাই। তারে কইছিলাম তার আর আমার ছোট্ট আম্মার লাইগ্যা সোনার চেইন কিইন্যা নিমু। এখন খালি হাতে দেশে যাইতাছি। দেশে গিয়া কি করুম, কেমনে মেয়েডারে মানুষ করুম কন—মইরা যাইতে মন চাইতাছে আফা। করিমরে, আমগোরে মাফ কইরা দেন আফা।“

আমি নিশ্চুপ, আমারো মরে যেতে ইচ্ছা করছিল। একী করলাম আমি! চোখ মুছে তিনি আবার বল্লেন,
“আপ্নের গন্ধ লাগতেছে জানি আফা। এই দেশেথ এমন ঠাডাপরা গরম, উনিফরমের মোটা কাপড়ের তলে ফোস্কা পইরা গইল্যা ঘাও হইয়া গেছে। ঘাও থেইকা এমন দূর্গন্ধ বাইর হয়। দেশের ইজ্জ্বত ধূলায় মিটাইতে চাই নাই আফা। মাফ কইরা দেন।“

দেশে ফেরার, স্ত্রীকন্যার সাথে মিলনের খুশির বদলে বেদনা ভারাক্রান্ত জীবনযুদ্ধে পরাজিত মানুষটিকে দেখে বুকটা ভেঙ্গে যাচ্ছিল। এদের রক্ত পানি করা টাকায় দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরে, ঘুরে সব মন্ত্রী উপমন্ত্রীর গাড়ির চাকা, আর তাদের হয়ে তাদের অধিকার আদায়ের বেলা কেউ নেই। কুন্তিও কর্ণকে এত অনাদর করেনি, যা করেছে আমার মাতৃভুমি এই খেটে খাওয়া মানুষদের প্রতি। রাগে ক্ষোভে মরমে মরে গেলাম। দ্বিতীয়বারের জন্য লজ্জায় মাথা কাটা গেল আমার। মাথা নিচু করে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। উৎকট সেই দূর্গন্ধকে অনেক আপনার মনে হতে লাগল।

হয়তো গল্প


ফ্রেন্ডরা মিলে চক্কর দিচ্ছিলাম বইমেলাতে। হাঁটতে হাঁটতে পা ব্যথা হয়ে যাওয়াতে বসলাম বাংলা একাডেমীর সিঁড়িতে। ওরা গেল অন্যপ্রকাশে। যাক বাবা, যে ভিড়, আমার শখ নেই এর ভেতরে ঢোকার। বসে বসে দেখছি চারপাশের কোলাহল। আচ্ছা আমরা সবাই কি খুব একা? এত কোলাহল আমাকে তো ছুঁয়ে যাচ্ছে না। ওই তো আমার বন্ধুরা, হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে এক একজন। আবার ওদিকের সাদা জামা পড়া মেয়েটা কি নিয়ে যেন ঝগড়া করছে বয়ফ্রেন্ডের সাথে। আরে, এই ছোট বাবুটা কি কিউট। আচ্ছা আমার যদি একটা বাবু থাকতো ,কেমন হত তখন?
-আপনি, মানে তুমি নিশা না?
ভাবনার জাল ছিড়ে গেল আমার। তাকিয়ে দেখি আবির।
--আরে, তুমি, কেমন আছ?
-এইতো ভালই।অনেক দিন পর দেখা না?
--হুমম, তা ৩/৪ বছর তো হবেই।
-একা একা বসে আছো যে?
--এই তো ফ্রেন্ডরা মিলে এসেছি। ওরা আছে আশেপাশেই। তুমি?
-আমি.এই তো আসলাম একাই,ভাবলাম ঘুরে যাই।
অনেক দিন পর দেখা হওয়াতে একথা-সেকথা বলছিলাম দুজনে। আমার ফ্রেন্ডরা চলে এল । আবিরকে বললাম, যাই তাহলে ।
ঠিক আছে বলে আবির বললো- নিশা, ও কিন্তু এখনো তোমার জন্য অপেক্ষা করে আছে।
আমি হাসলাম একটু, বললাম পাগলামি সারার জন্য ৮ বছর তো যথেষ্ট সময়।
-তার মানে তুমি স্বীকার করছো ওর ভালবাসা সত্যি,পাগলামি না?
--থাকনা আবির এসব কথা। যাই আমি। ভাল থেকো।
বলে চলে এলাম । আসার সময় রিকশাতে সারা পথই তিথি যথারীতি অনেক বকবক করে গেল। কিন্তু আজ কেন যেন আমার মাথাতে ওর কোন কথাই ঢুকলোনা। বারবার মনের মাঝে ভেসে উঠছিল একটি ছবি-নিলয়, যাকে ৮ বছর আগেই মুছে ফেলেছিলাম নিজের জীবন থেকে।

তখন কতই বা বয়স আমাদের। সামনে এস.এস.সি পরীক্ষা । স্কুলের ফার্স্ট গার্ল আমি । ভাল রেজাল্ট করার জন্য দিনরাত পড়ে যাচ্ছি । একদিন কোচিং থেকে ফেরার পথে আবির ডাকলো আমাকে। বললো তোমার সাথে কিছু কথা আছে । আমি দাঁড়ালাম,কিন্তু আবির কেন যেন নিলয়কে ঠেলে পাঠালো আমার সামনে। আমি একটু চমকালাম ।যে ছেলে কখনো কোন মেয়ের মুখের দিকে তাকায়না, কথা বলা তো অনেক পরের কথা।সে নিলয় আমাকে কি বলবে?
কিন্তু ও যা বললো শুনে আমি স্তব্ধ। আমাকে ভালবাসে ও। একথা অনেক বার অনেকের মুখ থেকে ওই বয়সেই শোনা হয়েছে আমার। সবাইকে যা বলি ওকে ও তাই বললাম । আমার পক্ষে সম্ভব না । বলে চলে এলাম আমি ।
ওইটুকু বয়সে পড়াশোনাই ছিল আমার সবকিছু। সুতরাং এই ব্যাপারটা তেমন পাত্তা দিলামনা আমি । কিন্তু এরপর থেকে প্রতিদিন বিকেলে নিলয় এসে দাঁড়িয়ে থাকতো আমার বাসার সামনে। দুই-তিন দিন খেয়াল করার পর আমি ছাদে যাওয়া ও বন্ধ করে দিলাম । পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল । হলে ঢোকা বা বের হওয়ার সময় দেখতাম নিলয় তাকিয়ে আছে । আমি ভাবতাম ওর কি পরীক্ষা নিয়ে কোন চিন্তা নেই নাকি? যাই হোক,আমার কি।
এভাবে এক সময় পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল ।রেজাল্ট ও হল । যথারীতি আমার রেজাল্ট হল সবচেয়ে ভাল। ভাল কলেজে ভর্তি হলাম । কিন্তু নিলয়ের রেজাল্ট ভাল হয়নি । কস্ট পেলাম শুনে। কারণ ও ছিল সেকেন্ড বয় । আমার জন্যই রেজাল্ট খারাপ করলো হয়তো ।
দিন কাটতে লাগলো । কলেজ পেরিয়ে ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম । একদিন রাতে আবির ফোন দিল আমাকে । বললো নিলয় এখনো আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে । ৩/৪ বছর তো হল । এখন তো আমি ভাবতে পারি ওর কথা । আমি যথারীতি না করে দিলাম । এরপর শুরু হল এক যন্ত্রণা । ওদের একটা ফ্রেন্ড সার্কেল ছিল । সবাই ছিল আমার পরিচিত । প্রতিদিনই দেখা যেত কেউ না কেউ ফোন করে আমাকে নিলয়ের কথা বলছে । বিরক্ত হয়ে গেলাম আমি । নিলয়কে ফোন করলাম। ও ফোন ধরতেই দিলাম এক ঝাড়ি আর বললাম তোমার ফ্রেন্ডরা যেন আমাকে আর তোমার কথা বলে বিরক্ত না করে। কিন্তু ও বললো ও নাকি কিছুই জানে না। সেটা শুনে ওকে মিথ্যাবাদী বলে ঝাড়ি দিয়ে ফোনটা রেখে দিলাম আমি ।

পরে অবশ্য জানতে পেরেছিলাম নিলয় আসলেই কিছু জানতোনা। কিন্তু তখন আর স্যরি বলা হয়নি ওকে । এরপর কেটে গেছে আরও ৪ বছর । যেদিন আমি ওকে না করি সেদিন ও বলেছিল ওর ভালবাসা সত্যি হলে আমি নিজেই ফিরবো ওর কাছে । ও আর কখনো সামনে আসেনি আমার ।আমি ও ব্যস্ত ছিলাম নিজের পড়াশোনা নিয়ে । ভার্সিটি লাইফেও অনেকেই প্রপোজ করেছে । কিন্তু কেন যেন সবাইকেই না করেছি আমি। আমার ফ্যামিলিকে আমি কষ্ট দিতে চাই না। বাবা-মার পছন্দেই বিয়ে করবো ভেবে রেখেছি । তাহলে আজ কেন নিলয়ের কথা এত ভাবছি আমি? আর ওই বা কেন এতদিন অপেক্ষা করবে আমার জন্য ? আমি কি কারো জন্য এত দিন অপেক্ষা করতাম?এখন তো দেখি একটা অ্যাফেয়ার ভাঙার দু-মাসও যায়না, নতুন বাঁধনে জড়ায় সবাই। নিলয় কি তবে সত্যিই ভালবাসে আমাকে? কেন যেন আজ ওকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে...