expr:class='"loading" + data:blog.mobileClass'>
চলছে । চলবে । অবিরাম...

একটি সত্যিকারের ভালবাসার গল্প

চার বছর বয়সে গুটিবসন্ত ও প্রচণ্ড জ্বরে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলে মেয়েটি। ডান পা-টাও হয়ে পড়ে অবশ। ক্র্যাচে ভর দিয়ে হাঁটে মেয়েটি, আলুথালু বেশ। ১৫ বছর ধরে সবাই তাকে মানসিক প্রতিবন্ধী বলেই জানত।

একদিন মেজবানিতে পরিচয় হয় এক রিকশাচালকের সঙ্গে। মেয়েটিকে রিকশায় বাড়ি পৌঁছে দেন তিনি। এরপর থেকে কি জানি কিসের টানে প্রায়ই ওই বাড়িতে চলে যেতেন রিকশাচালক। মেয়েটির সামনে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বকবক করতেন। কয়েক দিনেই মেয়েটির মাঝে পরিবর্তন আসে। সবাইকে চমকে দিয়ে একদিন কথা বলে ওঠে সে। রিকশাচালক তাঁর মনের কথা জানান। সাড়া দেয় মেয়েটিও। তারপর বিয়ে, সংসার। চিকিত্সা করানোর পাশাপাশি স্ত্রীকে এখন বর্ণমালা শেখাচ্ছেন দরিদ্র ওই রিকশাচালক।

প্রতিবন্ধীর সঙ্গে প্রেম, অতঃপর বিয়ের এই ঘটনাটি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার। রিকশাচালক নুরুল আবছারের (৩১) বাড়ি কক্সবাজারের রামু উপজেলার বড়বিল গ্রামে। জীবিকার তাগিদে বছর পাঁচেক আগে রাঙ্গুনিয়ায় আসেন।

আর হাছিনা বেগম (২২) রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ইছামতি গ্রামের মৃত শাহ আলমের মেয়ে। হাছিনা যে বছর গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়, তার পরের বছর তাঁর বাবা মারা যান। তিন মেয়েকে নিয়ে মা হালিমা বেগম পড়েন অথই সাগরে। বিভিন্ন বাড়িতে ঝিয়ের কাজ শুরু করেন। তাতে হাছিনার চিকিত্সা তো দূরে থাক, তিন বেলা সবার খাবারই হতো না। অনাদর, অবহেলায় বেড়ে ওঠে হাছিনা।

২০০৭ সালে বড়বিল গ্রামে ম্যাজবানির অনুষ্ঠানে নুরুল আবছার ও হাছিনা বেগমের দেখা। তখন হাছিনার বয়স ১৯  লাঠিতে ভর দিয়ে মেজবান খাওয়ার আশায় গিয়েছিলেন সেদিন। আর রিকশাচালক নুরুল ভাড়া নিয়ে গিয়েছিলেন অনুষ্ঠানে। খাবারদাবারের আয়োজন দেখে এক কোণে বসে পড়েন। থালা সামনে নিয়েছেন, এমন সময় আলুথালু বেশে কোত্থেকে এক তরুণী এসে তাঁর সামনে দাঁড়ান। একটু চিন্তা করে নিজের থালাটা তাঁর হাতে তুলে দেন। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন তরুণীটি। খাওয়ার পর তাঁকে রিকশায় করে বাড়ি পৌঁছে দিলেন। সেই থেকে শুরু।

নুরুল বলেন, ‘ম্যাজবানিতে প্রথম ওকে দেখে মনে কেমন একটা ধাক্কা লাগে। সেই থেকে হাছিনার টানে প্রতিদিন ওদের বাড়ি যেতাম। সঙ্গ দিতাম ওকে। এতে হাছিনার মাঝে পরিবর্তন দেখা দেয়। নির্বাক হাছিনা তোতলাতে তোতলাতে একদিন কথা বলে আমার সাথে।’

হাছিনার মা হালিমা বেগম জানান, মেয়ে কথা বলছে দেখে নুরুল তাঁকে একদিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলেন। ওষুধে মাত্র ১০ দিনেই হাছিনার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়। এর কিছু দিন পরই নুরুল বিয়ের প্রস্তাব দেন। মেয়ের প্রতি ছেলেটার দরদ দেখে রাজি হয়ে যান তিনি। ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে বিয়ে হয় নুরুল ও হাছিনার। তখন থেকে দুজন ইছামতী গ্রামেই আছেন।
নুরুল আবছার বলেন, ‘বিয়ের পর হাছিনার খাওয়াদাওয়া, কাপড়চোপড় পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন রাখার কাজ করেছি। আমি নিজে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছি। প্রতিদিন রিকশা চালানো শেষে রাতে ওকে নিয়ে বসি। অ আ ক খ শিখাই।’

স্ত্রীর প্রতি নুরুলের এমন দরদ দেখে প্রতিবেশীরা তাঁকে স্থানীয় সামাজিক সংগঠন এওয়াকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেয়। সংগঠনটি তার চিকিত্সায় অর্থসহায়তা দেয়। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর নুরুল-হাছিনা দম্পতির ঘরে একটি ছেলে জন্মায়। শিশুটি সুস্থ আছে।

এওয়াকের সভাপতি নির্মল কুমার বড়ুয়া বলেন, ‘মেয়েটিকে ভালোবেসে বিয়ে করে নুরুল বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ভালোবাসা দিয়ে সে শুধু হাছিনার মুখে ভাষা ফুটায়নি, তাকে অক্ষরজ্ঞানও দিচ্ছে।’ ইছামতী গ্রামের করিম উদ্দিন বলেন, ‘হাছিনারা আমার প্রতিবেশী। সেই ছোটবেলা থেকে মেয়েটাকে দেখছি। একটু বড় হওয়ার পর মেয়েটার কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়। এখন ভাঙা ভাঙা ভাষায় কথা বলতে পারে।’

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কর্মকর্তা বিজন কান্তি বিশ্বাস বলেন, ‘এমন রোগে চিকিত্সার অভাবে মানুষ বিকলাঙ্গ এমনকি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলতে পারে। তবে প্রয়োজনীয় চিকিত্সা দিলে আবার সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারে।’ তিনি জানান, হাছিনা বেগম ইতিমধ্যে ৫০ ভাগ সুস্থ হয়ে উঠেছেন। সুচিকিত্সা পেলে ধীরে ধীরে তাঁর পা-টাও ভালো হয়ে উঠবে বলে তিনি আশাবাদী।

হাছিনা বলেন, ‘আঁই দুই বছর আগেও জীবন লই এত সচেতন ন ছিলাম। হনদিন (কোনো দিন) ন ভাবি আঁই সংসার গইজুম (হব), কেউ আঁরে বিয়ে গরিবো। কিন্তু জামাইর ভালোবাসায় আঁই বাঁচি থাগনোর শক্তি পাই। এখন জীবনকে নতুন করি গড়নের স্বপ্ন দেখতেছি। মনে স্বাদ জাগে জামাইর জন্য কিছু গরি। কারণ ওই মানুষ্য আঁরে ভালোবাসি নিজের বিয়াককিছু (সবকিছু) জলাঞ্জলি দিয়ি (দিল)।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন